ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২১, ১১:৫৪ পিএম

ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সংহতি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) মদিনার মাটিতে পা রেখেই মসজিদ গড়ে তোলেন এবং যারা মসজিদে নববি থেকে দূরে মদিনার উপকণ্ঠে বসবাস করত, তাদের জন্য পৃথক মসজিদ নির্মাণ ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেন, যেন তাদের মধ্যে ধর্মীয় নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। তখন শিক্ষা, দাওয়াত, রাষ্ট্রীয় পরামর্শ, কূটনৈতিক আলোচনাসহ সবকিছু মসজিদেই হতো। তাই রাসুলের যুগের মসজিদ বর্তমান যুগের ধর্মীয় প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের সমার্থক।

মুসলমানের ধর্মীয় জীবনের গতিপথ নির্ণয়ে ইসলামি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণে শরিয়ত নির্ধারিত মাপকাঠি রয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রধান শর্ত ইমান। অবিশ্বাসী ব্যক্তি ইসলামি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়ার যোগ্য নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদেরকেই আল্লাহ হেদায়েতের পথে পরিচালিত করেছেন। তুমি তাদের পথের অনুসরণ করো। ...’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৯০)

এছাড়া আল্লাহভীতি, সততা ও নিষ্ঠার মতো গুণ ধর্মীয় নেতাদের জন্য আবশ্যক। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ যেসব ঘরকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং তাতে তার নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে সেই সব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় তাদের আল্লাহর স্মরণ, নামাজ কায়েম এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখতে পারে না। সেদিনকে তারা ভয় করে যেদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়বে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩৬-৩৭)

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মূলনীতি হলো, তাতে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ থাকবে এবং মতামত দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। তবে নীতিনির্ধারণ করবেন আল্লাহভীরু ও ধর্মীয় গুণসম্পন্ন ব্যক্তিরা। আর্থিক অবদানের ভিত্তিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণ গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হাজিদের পানি পান করানো এবং মসজিদুল হারাম আবাদ করাকে তোমরা কি সেই ব্যক্তির কাজের সমপর্যায়ের মনে করো, যে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে এবং আল্লাহর পথে লড়াই করে? তারা কখনোই আল্লাহর কাছে সমমর্যাদার হতে পারে না। আল্লাহ জালিমদের সঠিক পথ দেখান না। (সুরা : তওবা, আয়াত : ১৯)

তাছাড়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা চরম নিন্দনীয়। মক্কার কুরাইশরা মসজিদুল হারামের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে গর্ববোধ করত এবং সেখানে মানুষের প্রবেশাধিকার ও ধর্মীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করত। আল্লাহতায়ালা তাদের এই প্রবণতার নিন্দা করে বলেন, ‘তাদের মধ্যে এমন কী বিষয় রয়েছে যে, আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না যখন তারা মানুষকে মসজিদুল হারামে যেতে বাধা দেয়? অথচ তারা এর তত্ত্বাবধায়ক নয়; আল্লাহভীরুরাই এর তত্ত্বাবধায়ক। কিন্তু তাদের বেশিরভাগ লোক বিষয়টি জানে না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৩৪)

আয়াতে আল্লাহ তাদের অবদান-ঐতিহ্যের ওপর আল্লাহভীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সুতরাং মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক হবেন মুসলিম সমাজের আল্লাহভীরু ও ধর্মীয় বিবেচনায় অগ্রগামী ব্যক্তিরা। অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, অংশীবাদীরা আল্লাহর মসজিদ আবাদ করার যোগ্যতা রাখে না, যখন তারা নিজেরাই নিজেদের অবিশ^াসের স্বীকারোক্তি দেয় ।...’ (সুরা : তওবা, আয়াত : ১৭)

আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমার পিতা আব্বাস (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে বদর যুদ্ধে বন্দি হন। মুসলমানরা তার মতো বুদ্ধিমান লোককে কুফর ও শিরকের ওপর অবিচল থাকার কারণে ভর্ৎসনা করে। তখন তিনি বলেন, ‘তোমাদের কি জানা নেই, আমরাই তো বাইতুল্লাহ ও মসজিদে হারামকে আবাদ করে রেখেছি। আমরাই তো হাজিদের জন্য পানির ব্যবস্থা করি। তাই আমরা এর মুতাওয়াল্লি।’ আব্বাসের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আয়াতটি নাজিল হয়। (আল বাহরুল মুহিত : ৫/১৮)

তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে হলে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন এবং শরিয়তের আনুগত্যের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সেই আহ্বান করেই আল্লাহতালায়া বলেন, ‘তারাই তো আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, তারাই হবে সঠিক পথপ্রাপ্ত মানুষদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : তওবা, আয়াত : ১৮)

আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘মসজিদ আবাদের অর্থ কেবল তার চাকচিক্য ও বাহ্যিক সৌন্দর্যবর্ধন নয়, বরং তাতে আল্লাহর আলোচনা করা, আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করা এবং মসজিদকে সব ধরনের শিরক ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখা।’ (ইবনে কাসির, খ- ১, পৃষ্ঠা ২৭০)

যারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছেন কিংবা মুসলিম সমাজের যেকোনো পদে আসীন হয়েছেন তারা সবাই আবুবকর সিদ্দিক (রা.)-এর নিচের বক্তব্য থেকে নির্দেশনা নিতে পারেন। বক্তব্যে তিনি মুসলিম সমাজের একজন নেতার মনোভাব কেমন হবে এবং তার ক্ষমতার পরিধি কতটুকু তা স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের শাসক নিয়োজিত হয়েছি। অথচ আমি তোমাদের থেকে উত্তম নই। আমি যদি ভালো করি তবে আমাকে সাহায্য করবে। আমি ভুল করলে শুধরে দেবে। সত্য হলো আমানত রক্ষা করা আর মিথ্যা হলো বিশ^াসঘাতকতা।... আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করব, ততক্ষণ তোমরা আমার আনুগত্য করবে। যদি আমি আল্লাহর অবাধ্য হই তবে আমার নেতৃত্বের আনুগত্য তোমাদের জন্য আবশ্যক নয়।’ (আল হুকমু ওয়াল ইদারা ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৮২-৮৩)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত