করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে প্রায় ১০ মাস পর মন্ত্রিসভা বৈঠকে সশরীরে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভা কক্ষে মন্ত্রিসভা বৈঠকে অংশ নেন তিনি। গত বছরের ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে গণভবনে মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল। এরপর থেকে মন্ত্রিসভার বৈঠকগুলো ভার্চুয়ালি হয়েছে। সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা এতে অংশ নেন। আর গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকালের বৈঠকে ছয়জন মন্ত্রী অংশ নিয়েছেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী মন্ত্রীরা এজেন্ডা সংশ্লিষ্ট ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বাম পাশে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আর ডান পাশে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বসেছিলেন। আর সামনের দিকে এক পাশে অন্য চারজন মন্ত্রী এবং আরেক পাশে মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ অন্য সচিবরা বসেন। অংশগ্রহণকারী সবার মুখেই মাস্ক ছিল।
গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ২৫ মার্চ থেকে অফিস-আদালত টানা ৬৬ বন্ধ ছিল।
জাহাজ রপ্তানি আয় ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য : ২০২৫ সালের মধ্যে জাহাজ রপ্তানি আয় বছরে ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ‘জাহাজ নির্মাণশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা-২০২১’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বিশ্বে জাহাজ নির্মাণশিল্পে নেতৃত্বে ছিল জার্মানি ও ইতালি। এসব দেশ এই শিল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে এনেছে। তারা এখন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্য দেশে জাহাজ তৈরি করছে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, জাহাজ নির্মাণ খাতের উৎপাদন বাড়ানো, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প প্রসার, কাজের সুযোগ বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানো, রপ্তানি আয় বাড়িয়ে জাহাজ নির্মাণশিল্পের টেকসই বিকাশের জন্য এ নীতিমালা করা হয়েছে। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণশিল্পকে বিশ্বে জাহাজ নির্মাণশিল্পের উপযুক্ত অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা এ নীতিমালার লক্ষ্য। জাহাজ রপ্তানির বর্তমান আয় ১ বিলিয়ন ডলারকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। চার বছরের মধ্যে জাহাজ নির্মাণ খাতের কর্মী সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা নীতিমালার উদ্দেশ্য। জাহাজ নির্মাণের সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে তাদের ঋণ সহায়তা, ট্যাক্স ও ভ্যাট সুবিধা দেওয়াও বিষয়টি এ নীতিমালার মধ্যে আছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘জাহাজ নির্মাণ আমাদের জন্য অত্যন্ত ভালো ইন্ডাস্ট্রি। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের জন্যও জাহাজ তৈরি করতে পারব। এতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।’
বয়লার ব্যবহারে অনিয়ম করলে জেল-জরিমানা : শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত বয়লার থেকে নিবন্ধন নম্বর অপসারণ, পরিবর্তন বা বিকৃত করলে জেল-জরিমানার বিধান রেখে ‘বয়লার আইন, ২০২১’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
এতে বলা হয়েছে, ১৯২৩ সালের আইন দিয়ে বর্তমানে দেশে বয়লার সেক্টর পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো মালিক বয়লারের গায়ে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত বা সংযোজিত নিবন্ধন নম্বর অপসারণ, পরিবর্তন, বিকৃত ও অদৃশ্যমান করে অন্য কোনো বয়লার ব্যবহার করলে দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে। মোবাইল কোর্ট আইন এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে। প্রধান বয়লার পরিদর্শক শুনানির সুযোগ দিয়ে এক লাখ টাকা এবং দ্বিতীয়বার এ অপরাধ করার জন্য দ্বিগুণ জরিমানা করতে পারবেন। শিল্প সচিবের নেতৃত্বে বোর্ড পুনর্গঠন হবে।
মন্ত্রণালয়ের সচিব বোর্ডের প্রধান হলে তার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে দেশ রূপান্তরের এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘কেবল তো এটার নীতিগত অনুমোদন হলো, এ বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়কে লিখব।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খসড়া আইনে বয়লার দপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হবে না। বর্তমানে দপ্তর যে মর্যাদায় আছে সেই মর্যাদায়ই থাকবে। অধিদপ্তরের মর্যাদা দেওয়া হয়নি।’
এ ছাড়া সব করপোরেশনকে একটি কর্র্তৃপক্ষের অধীনে আনার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে আগের একটি কমিটি পুনর্গঠন করেছে মন্ত্রিসভা। ‘সরকারি করপোরেশন (ব্যবস্থাপনা সমন্বয়) আইন’ প্রণয়নের প্রয়োজন নিরূপণের বিষয়ে ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা থেকে গঠিত কমিটি পুনর্গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ১৯টি মন্ত্রণালয়ের ৫০টি করপোরেশন আছে। এসব করপোরেশন আলাদা আইন দিয়ে গঠিত হলেও যেন এগুলোর ব্যবস্থাপনায় মিল রাখার জন্য ২০১৫ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। আগের মতোই অর্থমন্ত্রীকে ওই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। কমিটিতে নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন কৃষিমন্ত্রী।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আগে অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট, পরিকল্পনা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রীকে নিয়ে একটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটির দায়িত্ব ছিল সরকারের করপোরেশনগুলোর ব্যবস্থাপনায় একটি কর্র্তৃপক্ষের অধীনে আনা যায় কি না এবং এ ক্ষেত্রে শিল্প মন্ত্রণালয়কে লিড মন্ত্রণালয় করা যায় কি না, সে বিষয়ে মতামত দেওয়া। এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০১৯ সালে অর্থমন্ত্রীর কাছে যখন এটা উপস্থাপন করা হয় উনি একটা পর্যবেক্ষণ দেন যে এটা যেহেতু আগের সংসদের ছিল, এখন নতুন সংসদ ও মন্ত্রিসভা এসেছে, তাই এটাকে আবার মন্ত্রিসভায় পাঠানো হোক।’
গতকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের অবসর সুবিধাদি বৃদ্ধি, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং এ সংক্রান্ত অটোমেশন কার্যক্রম সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়েছে।
