বিদ্রোহে নাকাল তৃণমূল কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ চায়

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২১, ০২:০৫ এএম

জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার কঠোর অবস্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবুও ভোটের মাঠে বিদ্রোহী প্রার্থী শেষমেশ থাকছেই। বিভিন্নভাবে হুঁশিয়ারির পরও দমন করা যাচ্ছে না বিদ্রোহীদের। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে ঘটছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও। বহিষ্কারের ভয়ভীতিসহ কঠোর অবস্থান জানান দিলেও বিদ্রোহী দমনে কোনোভাবেই সফল হচ্ছে না দলটি। আবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী ভোটে জিতেও আসছেন। এ পরিস্থিতিতে দলের

তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, বিদ্রোহী প্রার্থী শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হলে মন্ত্রী-এমপি ও দলের প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আশকারা বন্ধ করতে হবে সবার আগে।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সময় সারা দেশে বিদ্রোহী প্রার্থীর পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়েন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা। শুধু বিদ্রোহী প্রার্থীকে শাস্তির আওতায় না এনে শাস্তি দিতে হবে এসব আশ্রয়দাতাদেরও। আবার অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অযোগ্য প্রার্থীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষোভ থেকেও দেখা দিচ্ছে বিদ্রোহ। যার ফল হিসেবে বিদ্রোহী দমনে পুরোপুরি সফল হওয়া যাচ্ছে না। এসব নৈরাজ্য থামাতে পারলেই কেবল বিদ্রোহী প্রার্থীদের ভোট করার প্রবণতা কমবে।

তৃণমূলের ওইসব নেতা আরও বলছেন, দলের অনেক নেতা দলের ভেতরে ‘নিজস্ব লোকের’ একটি বলয় তৈরি করে রেখেছেন। দলের চেয়ে নিজের লোককে রাজনীতিতে প্রাধান্য দিতে চান তারা। দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্তে নিজের পছন্দের লোক মনোনয়ন না পেলে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা আশকারা দিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দেন বলেই দমন করা যাচ্ছে না বিদ্রোহীদের আধিক্য। প্রমাণসাপেক্ষে সবচেয়ে আগে এসব প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলেই কেবল শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বিদ্রোহী প্রার্থী।

তৃণমূল নেতারা আরও বলেছেন, দলের নীতিনির্ধারকরা সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান দেখাচ্ছেন বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে, কিন্তু অঞ্চলভিত্তিক কিছু প্রভাবশালী নেতা প্রকৃতপক্ষে দলের হাইকমান্ডের কঠোর অবস্থানকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন বলেই এ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনই বিদ্রোহী প্রার্থী মুক্ত হয়নি। ওইসব প্রভাবশালী নেতা দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে কে কার লোকএভাবে না দেখে ওই প্রার্থী দলের জন্য কতখানি যোগ্য, কতখানি ত্যাগ ও কতখানি জনসম্পৃক্ত সেসব শতভাগ আমলে নিয়ে এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে মেনে নিলে কেন্দ্রের হুঁশিয়ারি আমলে নিত বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

সর্বশেষ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের উদাহরণ টেনে চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ৪১টি ওয়ার্ডে অন্তত ৯২ জন বিদ্রোহী দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়েছেন। দলের হাইকমান্ডের কঠোর অবস্থান থাকা সত্ত্বেও এসব বিদ্রোহীর বেশিরভাগকেই নির্বাচন থেকে বসানো সম্ভব হয়নি। এরা সবাই দলের কোনো না কোনো নেতার আশকারায় ভোট করেছেন। বিদ্রোহী সাতজন কাউন্সিলর বিজয়ীও হয়েছেন। এই চিত্র অন্য বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাহস জোগায়।’

গত বুধবার অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে মোট ৫৫টি ওয়ার্ডে (সাধারণ ও সংরক্ষিত) আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে জয়ী হয়েছেন দলটির ৮ বিদ্রোহী প্রার্থী। এরমধ্যে একজন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরও রয়েছেন।

বিদ্রোহী দমনে সফল হতে হলে আগে তাদের মদদদাতাদের লাগাম টানতে হবে বলে মনে করেন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনম সেলিম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনে বিদ্রোহী দমনে কঠোর হতে হবে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও মদদদাতাদের ব্যাপারেও। স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হন তারা সবাই স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের আশকারা পান। বিদ্রোহী প্রার্থীরা মনে করেন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা পক্ষে থাকলে কেন্দ্রের কঠোর অবস্থানেও তাদের তেমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না। ফলে বিদ্রোহীদের দমন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদ্রোহী দমনে ব্যর্থতায় হতাশা প্রকাশ করে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌর নির্বাচনের তিন দফায়ই বিদ্রোহীরা প্রার্থী হয়েছে এবং বিজয়ও লাভ করছে তাদের অনেকেই। কেউ ওয়ার্ড কাউন্সিলর, এমনকি দুই-তিন পৌরসভায় মেয়রও বিদ্রোহী নির্বাচিত হয়েছেন। এগুলো রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। কেন্দ্র কঠোর অবস্থানে থাকলেও বিদ্রোহী দমনে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকায় দলে যে সুবিধাভোগী মহল তৈরি হয়েছে তারা বিভিন্নভাবে স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীর লোক সেজে বসে আছেন। নির্বাচন আসলেই মনোনয়ন বঞ্চিত হলে ছলচাতুরী করে তারা ভোট করার জন্য মঠে নেমে পড়েন।’

বিদ্রোহী দমন প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যেও একটি অংশ মনে করেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা সম্পৃক্ত থাকেন বলেই কেন্দ্রের জোরালো তৎপরতা সত্ত্বেও তাদের ব্যাপারে সফল হওয়া যাচ্ছে না। তবে তারা বলেন, কেন্দ্রের কঠোর অবস্থান থাকায় অন্তত এবার অনেকখানি সফল হতে পেরেছেন। ভবিষ্যতে আরও সফলতা আসবে। আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে। কেন্দ্রীয় নেতারা আরও বলেন, আশ্রয়দাতাদের সম্পৃক্ততার ব্যাপারটি জানলেও উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না বলে বেঁচে যান তারা। এছাড়াও যেসব প্রক্রিয়ায় একজন যোগ্য প্রার্থী বেছে নেওয়া হয় সেখানে তথ্যগত ভুল কেন্দ্রে আসায় উপযুক্ত প্রার্থী মনোনয়ন বঞ্চিত হন। ফলে যোগ্য নেতা ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহ প্রকাশ করে ভোট করেন। তবে আগামীতে এ ব্যাপারে আরও কঠোর ও অনড় অবস্থান গ্রহণ করবে দলটির নীতিনির্ধারকরা।

যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ পৌর নির্বাচনে তৃণমূলের সুপারিশ করা প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে সেখানে উপজেলা কৃষক লীগের নিচের সারির এক নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

চলমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপে গত ২৮ ডিসেম্বর ২৪টি পৌরসভার নির্বাচনে সাতটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। এরমধ্যে জয় পান দু’জন বিদ্রোহী। পরে গত ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের পৌর নির্বাচনে ৬১টি পৌরসভার মধ্যে ২১টিতেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা নিজ দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে লড়েন। যারমধ্যে পাঁচজন জয়লাভও করেন। ওই দুটি ধাপের পৌর নির্বাচনে কাউন্সিলর পদেও আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্য বিদ্রোহী প্রার্থী জয় ছিনিয়ে নেন। আজ শনিবার তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ৬৩টি পৌরসভার নির্বাচনেও অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়ছেন দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বেশকিছু কারণ সামনে চলে আসে। যেমন প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে আমরা যেসব তথ্য-উপাত্তকে অগ্রাধিকার দিয়ে চূড়ান্ত মনোনীত করি; দেখা যায় সেসব তথ্যে কিছু ভুলত্রুটি থাকে। অথচ তিনি যোগ্য। আবার মনোনয়নের প্রত্যাশায় দীর্ঘদিন ধরে একজন নেতা এলাকায় বিভিন্ন কাজ করে যান। মনোনয়ন বঞ্চিত হলে তিনি ক্রেজি হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে যান। এসব নানা কারণ রয়েছে।’

আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘বিদ্রোহীদের ব্যাপারে আমাদের যে অবস্থান রয়েছে তা অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকবে না।’

কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের পেছনে এলাকার প্রভাবশালী নেতাদের মদদ থাকে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলাকার প্রভাবশালী নেতাদের মদদ তো থাকেই। তবে সেটা সারা দেশে নয়। বিদ্রোহী দমনে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা সফল হয়েছি এবার। আগামীতে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।’

এদিকে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং তাদের মদদ বা উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে একইরকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গতকাল শুক্রবার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানম-ির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির পরিচিতি সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

বিদ্রোহী প্রার্থী এবং তাদের প্রশ্রয়দাতাদের হুঁশিয়ার করে ওবায়দুল কাদের বলেন, যারা দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছে এবং এখনো মাঠে আছে তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থান স্পষ্ট। বিদ্রোহীদের যারা মদদ অথবা উসকানি দিচ্ছে তাদেরও একই শাস্তি পেতে হবে। এ সকল বিদ্রোহী ও উসকানিদাতাদের অনতিবিলম্বে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, না হয় দল কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত