যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন ইরান পরমাণু চুক্তিতে ফেরার। নির্বাচনী জনসভায় তিনি পরমাণু চুক্তিতে ফেরা প্রশ্নে যতটা খোলামেলা ছিলেন, ক্ষমতায় বসার পর ততটাই কৌশলী হয়েছেন তিনি। ইরান যদি পরমাণু চুক্তি অনুসারে ইউরেনিয়াম উৎপাদন না কমায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ফিরবে না এমন অবস্থান নিয়েছেন বাইডেন। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা না হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চলতেই থাকবে।
বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ইরান আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের কৌশলের ব্যাপারে। পাল্টা কৌশল হিসেবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু দেশ চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়াতে শুরু করে। এমনকি ভূ-রাজনীতির জায়গায় রাশিয়ার সঙ্গে শীতল সম্পর্ক বজায় রাখা তেহরান এখন মস্কোর সঙ্গেও আলোচনায় বসেছে। এ সবই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধির পরমাণু সমঝোতাবিষয়ক একটি আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কূটনীতিকের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে এই রাখঢাককে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না চ্যাথামের মতো থিংকট্যাংকরা। যুক্তরাষ্ট্রের টিভি চ্যানেল ফক্স নিউজ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইরানের পরমাণু সমঝোতায় ফিরে আসবেন কি-না বা কীভাবে ফিরে আসবেন তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি রবার্ট ম্যালি সম্প্রতি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি নিশ্চিত করা বা এ আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা থেকে বিরত রয়েছে। অথচ চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মা ঝাওক্স সম্প্রতি বলেছেন, রবার্ট ম্যালির পক্ষ থেকে আগ্রহ দেখানোর পর তার সঙ্গে ইরানের পরমাণু সমঝোতা নিয়ে চীনা কর্মকর্তাদের আলোচনা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ইরান পরমাণু চুক্তির অন্যতম শরিক ইউরোপ কিন্তু এখনো তাদের সাবেক অবস্থানেই আছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই তারা ইরানকে নিয়ে নতুন চুক্তি করতে প্রস্তুত। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো একাধিকবার চেষ্টা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তিতে ফেরাতে। কিন্তু তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন তাকে হতাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাধারণত তাদের শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিকদের আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করে, বিশেষ করে সে আলোচনা যদি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হয়ে থাকে। কিন্তু চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ইরানবিষয়ক এবারের আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটল। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের আগে তার দেশকে ইরানের পরমাণু সমঝোতায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতা গ্রহণের পর বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসার আগে ইরানকে এই সমঝোতা সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তবে ইরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। কাজেই তাকে আগে ইরানের ওপর থেকে কার্যকরভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
তেহরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে না নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা শুরুর আশঙ্কা রয়েছে। এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা কোণঠাসা যুক্তরাষ্ট্র। নতুন করে উত্তেজনা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়তে পারে এমন সম্ভাবনা রয়েছে। আর এমনটা হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ইরান জোটের হাতে। এক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র সৌদি আরব। দেশটি এমনিতেই ইরান ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
