সঞ্চালন লাইনের অপর্যাপ্ততার কারণে সারা দেশে বিদ্যুৎ দিতে পারছে না সরকার। সঞ্চালন ব্যবস্থা জোরদার করতে উদ্যোগ নিয়েও হোঁচট খাচ্ছে তারা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি গলদে ভরা। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) কয়েকটি সূত্র বলছে, বিদ্যুতের সঞ্চালনের সব থেকে বড় প্রকল্পটি পেয়েছে চীনা তিন কোম্পানির কনসোর্টিয়াম। সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ওই প্রকল্পের পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) ও অগ্রিম অর্থের জামানত (এপিজি) ৬৬ মাসের দেওয়ার কথা থাকলেও দিয়েছে মাত্র এক বছরের। সাত বছর ধরে করা বিনা দরপত্রের প্রকল্পটিতে শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) রাখা হয়নি। এ রকম পরিস্থিতি সিসিসিই-ইটার্ন-এফইপিইসি মোট চুক্তিমূল্যের ১৫ শতাংশ অর্থ বা ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা অগ্রিম দিয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ। পিজিসিবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর দেওয়া ছাড়া কোনো প্রকল্প কীভাবে পিজিসিবির বোর্ড অনুমোদন দিলজানতে চাইলে পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি ২০১৬ সালে পাস হয়েছে। এসব ছাড়া ডিপিপি পাস হওয়ার কথা নয়। আমি তখন ভিন্ন সংস্থায় ছিলাম। সে কারণে এ বিষয়ে আমার জানা নেই।
দেশের সঞ্চালনব্যবস্থা শক্তিশালী ও ক্ষমতাবৃদ্ধির লক্ষ্যে এই মুহূর্তে ১৯টি প্রকল্প চালু রয়েছে পিজিসিবির। এসব প্রকল্পের অধিকাংশেরই একাধিকবার মেয়াদ বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প ছিল ‘পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক স্ট্রেনদেনিং প্রজেক্ট’। চীনের কোম্পানি সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং (সিসিসিই)ইটার্ন–এফইপিইসি কনসোর্টিয়াম বিনা দরপত্রে পেয়েছে কাজটি। প্রকল্পটির ব্যয় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ১১৪ কোটি ডলার) । এই অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক।
প্রকল্পে ৪১টি নতুন উপকেন্দ্র, ৩৫টি উপকেন্দ্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ৭৬৪ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণসহ বেশ কিছু কাজ রয়েছে। এগুলো সম্পন্ন হলে সারা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও গতি পাবে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চুক্তি হওয়া প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের জুনে। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পে কাজই শুরু হয়নি।
পিজিসিবির প্রকল্প সময়মতো শুরু না হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকার। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২১ হাজার মেগাওয়াট। উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ ১০ হাজার মেগাওয়াটের মতো। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে বিদ্যুৎ বিভাগকে কেন্দ্র ভাড়াবাবদ ৬৪ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে। অথচ এসব বিদ্যুতের বড় অংশ নিতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ সঞ্চালনব্যবস্থা দুর্বল থাকায়। সঞ্চালন লাইন ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের ক্ষমতা বাড়লে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও নিরবচ্ছিন্ন হতো।প্রকল্প আট বছরের ব্যাংক গ্যারান্টি এক বছরের
দেশের সঞ্চালন খাতের বড় উন্নতির জন্য ২০১৬ সালের অক্টোবরে সিসিসিই-ইটার্ন-এফইপিইসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি হয় পিজিসিবির। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হবে। এর চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ পিজি ও ১৫ শতাংশ এপিজি জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। গত বছরের ৩ নভেম্বর চীনা কনসোর্টিয়াম দুটি চেকে পিজি ও দুটি চেকে এপিজি জমা দেয়। আট বছরের প্রকল্পের পিজি ও এপিজির মেয়াদ মাত্র ১২ মাস, এটি শেষ হবে চলতি বছরের নভেম্বর মাসে।
পিজিসিবির অর্থ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বর্তমানে কার্যসম্পাদনের সময়সীমা ৫৪ মাস। প্রকল্প শেষে কোনো সমস্যা দেখা দিলে ঠিকাদারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য আরও এক বছর পিজির সময়সীমা থাকতে হবে। এ হিসাবে অন্তত ৬৬ মাস বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চেকের সময় থাকার সুপারিশ করেছে পিজিসিবির অর্থ বিভাগ।
কোনো প্রকল্পের পিজি রাখা হয় ওই প্রকল্প শেষে অন্তত দুই বছর কোনো ধরনের সমস্যা দেখে দিলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে যাতে বাধ্য করা যায় সে কারণে মোট চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ অর্থ রেখে দেওয়া হয়।
কোনো প্রকার শুল্ক ধরা হয়নি প্রকল্পে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি ঠিকাদারকে আমদানি শুল্ক দেওয়া লাগে না। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে যত ধরনের কাজ হয় তার শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক দেওয়া বাধ্যতামূলক। পিজিসিবির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, পিজিসিবির কোনো কাজের চুক্তিমূল্যের অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ থাকে। আমদানি করা যন্ত্রপাতির পেছনে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়। এই ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থের ওপর দেশি-বিদেশি সব কোম্পানিকে শুল্ক দিতে হয়। এই হিসাবে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ‘পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক স্ট্রেনদেনিং প্রজেক্ট’ তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা স্থানীয় পর্যায়ে নির্মাণকাজের পেছনে ব্যয় হবে। আর এ ধরনের ব্যয়ের পেছনে গড়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এই হিসাবে অন্তত ৪৫০ কোটি টাকা শুল্ক পাবে সরকার।
অথচ এ প্রকল্পে শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম শুল্ক বাবদ কোনো অর্থ রাখা হয়নি। বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চোখেও পড়েছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী শুল্ক ছাড়া প্রকল্প করা সম্ভব নয়। এটি গুরুতর ব্যত্যয়। গোটা প্রকল্পে কী পরিমাণ শুল্ক বাবদ ব্যয় হবে তা ফের খতিয়ে দেখতে পিজিসিবিকে বলা হয়েছে।
পিজিসিবির কর্মকর্তারা বলছেন, একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিপিপি) তৈরি হয়েছে। এটি পিজিসিবির বোর্ড পাসও করেছে। এ রকম মারাত্মক ত্রুটি থাকার পরও ডিপিপি কীভাবে পাস হয়েছে বলে তাদের মত।
আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে দেখাতে তারা শুল্ক বাবদ অর্থ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেনি। তখন শুল্ক বাবদ অর্থ প্রকল্পে যোগ করলে প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেশি দেখাত। এটি ত্রুটিযুক্ত প্রকল্প। এই প্রকল্পে যত ব্যয় দেখানো হয়েছে তা স্বাধীন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করা উচিত বলেও বিশেষজ্ঞদের মত।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংস্থা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ¦ালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, প্রথমত, বিনা দরপত্রে কাজটি পাওয়া নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হবে, সে কারণে বছরের পর বছর লাগানো হয়েছে, অথচ এ সময় দরপত্র করা যেত। এটি অনিয়ম। এই অনিয়মের পেছনে কারা কারা রয়েছে, তা সরকারকেই খতিয়ে দেখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু কাজ দেওয়ার মধ্যেই অন্যায়-অনিয়ম সীমাবদ্ধ নেই; এখন দেখা যাচ্ছে তারা যে প্রক্রিয়ায় কাজ পেয়েছে, সেখানে রাজস্বই ধরা হয়নি, গ্যারান্টি চেকের মেয়াদ ঠিক নেই; এসবে বোঝা যায় গোটা প্রক্রিয়ায় মারাত্মক গলদ রয়েছে। এত গলদের পরও যখন কোনো প্রকল্প পাস হয় তা দুর্নীতি ছাড়া আর কোনো বিষয় আছে বলে আমার মনে হয় না।
