ছয় বছর পর প্রত্যাহার হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি পণ্য রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা। গতকাল মঙ্গলবার বেবিচক চেয়ারম্যানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা জানান ঢাকার অস্ট্রেলীয় হাইকমিশনার এইচ ই জেরেমি ব্রুয়ের। আগামী মাস থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে প্রত্যাহারের সঙ্গে বেশ কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলো না মানলে আবারও নিষেধাজ্ঞার আভাস দিয়েছেন তিনি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য শুরুতেই বাংলাদেশ সরকার নানামুখী প্রচেষ্টা চালায়। বিশেষ করে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পযর্টন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। তারই ধারাবাহিকতায় গত মার্চে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিদল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের সঙ্গে ক্যানবেরা বাংলাদেশ হাইকমিশন ও বেবিচকের নিবিড় যোগাযোগ এবং সন্তোষজনক পরিদর্শনের ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো পরিবহনসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও বর্তমানে এখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা বিশ্বমানের। নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। সেজন্য কিছু শর্ত সাপেক্ষে তারা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা প্রত্যাহারের। এটা অবশ্যই আমাদের জন্য বড় ধরনের অর্জন।
শর্তগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূলত আরএ-৩ মেনে চলতেই হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়েছি। নিরাপত্তাসংক্রান্ত অন্যান্য শর্তও আমরা নিশ্চিত করেছি। কাজেই আর কোনো অজুহাত নেই।
বেবিচক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে আকাশপথে পণ্য রপ্তানির জন্য আরএ-৩ ব্যবস্থাপনায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে কার্গো পরিবহনে নিরাপত্তার এ স্তর কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। যা নিশ্চিত করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক আদেশে সিরিয়া, মিসর, বাংলাদেশ, ইয়েমেন ও সোমালিয়া থেকে কিংবা এসব দেশের মধ্যে দিয়ে ট্রানজিটের মাধ্যমে আকাশপথে পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অস্ট্রেলিয়ার পরিবহন নিরাপত্তা দপ্তর, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক উন্নয়ন বিভাগ ওই বছরের ১৯ ডিসেম্বর থেকে এ আদেশ কার্যকর করে। তারপর ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে মিসরের শারম আল শেখে রাশিয়ার একটি বিমান বোমা বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ব্রিটিশ কর্র্তৃপক্ষ ২০টি দেশের ৩৮ বিমানবন্দরকে নিরাপত্তা বাড়ানোর কথা বলে। শাহজালাল বিমানবন্দর ছিল তার একটি। এই ৩৮টি বিমানবন্দর থেকে লন্ডনে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বন্ধ থাকে দীর্ঘদিন। যদিও তারও আগে থেকেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন থেকে অনুরোধ করে আসছিল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া ঢাকা বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য যুক্তরাজ্যকে দায়িত্ব দেয়। মিসরের ঘটনার পর ব্রিটিশ এভিয়েশনের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের লিয়াজোঁ অফিসার জন লাভসে ঢাকা বিমানবন্দর পরিদর্শনে আসেন। তিনি নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য বেশকিছু সুপারিশ করেন। প্রথম রিপোর্টটি শুধু যাত্রী পরিবহনবিষয়ক নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরে ওই বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি তিনি ফের ঢাকা আসেন এবং দ্বিতীয় রিপোর্ট দেন, যেখানে কার্গো পরিবহনবিষয়ক সুপারিশ ছিল। তাতেই বাংলাদেশের ভাগ্যে বিপর্যয় নেমে আসে। যুক্তরাজ্য প্রথম রিপোর্ট দেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া এককভাবে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়াতে কার্গো সার্ভিসের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তখন যুক্তরাজ্যের রিপোর্টে বলা হয়, যাত্রীদের সঠিকভাবে স্ক্যানিং করা হয় না এবং মালামাল ট্যাগ করার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় না। এছাড়া কার্গো রাখার জায়গায় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের বেসরকারি কর্মীদের সরিয়ে নিতে বলা হয়, নিরাপত্তা ট্যাগ লাগানোর মেশিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয় এবং কার্গো ওয়্যারহাউজের বাইরের সব পণ্য ভেতরে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ সরকার আন্তর্জাতিক মানের কোনো নিরাপত্তা সংস্থা দিয়ে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার নির্দেশনা দেয়। তারপরই যুক্তরাজ্যের রেডলাইন নামে একটি কোম্পানিকে নিরাপত্তা উন্নত করার জন্য পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়। রেডলাইন এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির ওপর এখানকার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মীদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক সব স্ক্যানিং মেশিন স্থাপন করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ইউরোপ-আমেরিকা মানের। এখানে কার্গো পণ্য স্ক্রিনিংয়ে অ্যাভসেক ও বিজিবির ডগ স্কোয়াড কাজ করছে। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন দিয়েও ডগ স্কোয়াড নামানো হয়। সর্বশেষ সংযোজন করা হয় অত্যাধুনিক এক্সপ্লোসিভ ডিটেনশন সিস্টেম (ইডিএস)। তাতে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন যতগুলো শর্ত দিয়েছিল সব শর্ত পূরণ হয়। তারপরই ২০১৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া তারপরও নিরাপত্তা ইস্যুতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এ অবস্থায় চলে কূটনৈতিক তৎপরতা। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ইস্যুতে আরও কার্যকর ও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে।
