বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে টিকাগ্রহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশংসা, আলোচনা, সমালোচনা শোনা শেষে অনেক নাগরিক নিবন্ধন করেছি কভিড-১৯ টিকা নেয়ার আশায়। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ‘কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন: হাউ ইজ বাংলাদেশ ডুয়িং কম্পেয়ারড টু দ্য রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড?’ প্রতিবেদন অনুসারে আমরা জানতে পারলাম যে, ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখ পর্যন্ত কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের কমপক্ষে একটি ডোজ প্রাপ্ত লোকের সংখ্যা অনুসারে বিশ্ব টিকাদান প্রতিযোগিতায় একাদশতম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এই অবস্থান স্পেন, পোল্যান্ড এবং কানাডার চেয়ে এগিয়ে।
সেদিন একজন সহকর্মীর পাঠানো লরেন ওয়েবার ও হানাহ রেচ রচিত ‘কভিড ভ্যাকসিন ওয়েবসাইট ভায়োলেট ডিজঅ্যাবিলিটি ল’স, ক্রিয়েট ইনইকুয়েটি ফর দ্য ব্লাইন্ড’ প্রতিবেদনটি পড়ে নিজের অনেক প্রশ্নের উত্তর জেনে গিয়েছিলাম। আমি প্রতিবেদনটি পড়ে বুঝলাম, টিকাগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অথবা সরকার কেবল ভুলে গিয়েছেন এমন নয়, গোটা বিশ্বের সব উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশের সরকার ভুলে গিয়েছেন রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করে সেবা দেওয়ার বিষয়টির কথা।
তা সত্ত্বেও আমরা বলতে পারি, অন্য দেশ ভুলে গিয়েছে এই অজুহাতে আমাদের দেশের সেবাও শুরু করা যাবে না, এটা প্রশংসনীয় যুক্তি নয়।
কোভিড -১৯ মহামারী আমাদের জীবনকে এমন একটি অবস্থায় এনে দিয়েছে, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাই বেঁচে থাকার বড় একটি উপায় হয়ে উঠেছে বর্তমানে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করতে কতটা পারছেন আমাদের একটা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী সেই দিকটা মনে রাখা একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসের টিকার জন্য যে পোর্টালটি সরকার চালু করেছেন, এই পোর্টালের মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ একটি উপায়। তবে এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহজ কিনা সেটা আমরা ভাবিনি। ‘সুরক্ষা’ নামের এই পোর্টাল বা অ্যাপে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এই পোর্টালের মাধ্যমে যে তথ্যগুলো আমরা জানতে পারছি তা হলো টিকা নিবন্ধন, পরবর্তী করণীয়, এসএমএস বার্তা প্রাপ্তি, টিকা কার্ড প্রাপ্তি, টিকা কেন্দ্র, টিকাগ্রহণের সময়, টিকার ডোজ, চূড়ান্ত সনদপ্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়।
কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিবন্ধন করার জন্য সুরক্ষা পোর্টালে প্রবেশের পর আমরা দেখতে পাই এই কথাগুলো লেখা রয়েছে সেখানে- ‘নিচের ফরমে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্ম তারিখ (জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী) প্রদান করে ‘যাচাই করুণ’ বাটনে ক্লিক করলে নিবন্ধনের সময় প্রদানকৃত মোবাইল নম্বরে একটি OTP কোড SMS এর মাধ্যমে পাঠানো হবে, তা পরবর্তী OTP কোড ঘরে প্রদান করে ‘স্ট্যাটাস যাচাই’ বাটনে ক্লিক করলে স্ট্যাটাস জানা যাবে’।
তখন বাটন চাপলে আমরা দেখতে পাই, কতগুলো নির্দিষ্ট ধরন উল্লেখ করে দেওয়া রয়েছে টিকার নিবন্ধনের জন্য। সেগুলো হলো- নাগরিক নিবন্ধন (৪০ বছর ও তদুর্ধ), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এর সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী, অনুমোদিত বেসরকারি ও প্রাইভেট স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা কর্মকর্তা-কর্মচারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা, সম্মুখ সারির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী,
সামরিক বাহিনী, বেসামরিক বিমান, রাষ্ট্র পরিচালনার নিমিত্ত অপরিহার্য কার্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সম্মুখ সারির গণমাধ্যমকর্মী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সম্মুখ সারির কর্মকর্তা-কর্মচারী, ধর্মীয় প্রতিনিধি (সব ধর্মের), মৃতদেহ সৎকার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, জরুরী বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন ও সায়ার সার্ভিসের সম্মুখ সারির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও নৌবন্দরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, জেলা ও উপজেলাসমূহে জরুরী জনসেবায় সম্পৃক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রবাসী অদক্ষ শ্রমিক, জাতীয় দলের খেলোয়াড়।
বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম ‘সুবর্ণ নাগরিক’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে দেশের ১০% কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে বেঁচে আছেন। তাহলে তাদের কোভিড-১৯ টিকা নিবন্ধনের জন্য তৈরি ‘সুরক্ষা’য় একটি ধরন থাকা অত্ত্যন্ত জরুরী প্রয়োজন। আমরা আশা করব, সরকার দ্রুত এই ধরন অন্তর্ভুক্ত করবেন।
জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী: উন্নয়নকর্মী।
