করোনার টিকা নিয়ে দেশের মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তবে রাষ্ট্রীয় ও সরকারিভাবে স্বীকৃত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা করোনা টিকা কার্যক্রমের বাইরে রয়ে গেছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জটিলতার কারণে টিকা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষ।
আদমশুমারিতে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি না থাকায় হিজড়াদের আলাদাভাবে গণনা করা হয়নি। তাই চট্টগ্রামে হিজড়ার সংখ্যার কত, তা সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। সামাজিকভাবে গ্রহণ না করার কারণে মানবিক ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় টিকা নেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হিজড়ারা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও টিকা নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা করা উচিত।
শুক্রবার নগরীর ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমবাগান এলাকার রেলবিট সংলগ্ন একটি বস্তিতে কথা হয় হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিভিন্নজনের সঙ্গে। তাদের আক্ষেপ দেশের সব মানুষ করোনার গণ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসলেও হিজড়া হওয়ায় সেই সুযোগ তারা পাচ্ছেন না। কয়েকজন হিজড়া এবার ভোটার হলেও জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন পুরুষ কিংবা নারী পরিচয়ে, ফলে তারাও রেজিস্ট্রেশন করেননি টিকা নিতে।
আমবাগান এলাকায় শুক্রবার দুপুরে ময়ূরী হিজড়ার বাসায় কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি আক্ষেপ জানিয়ে বলেন, এখনও বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছি। টিকা নিব কীভাবে? কে টিকা দেবে আমাদের?। এনআইডি কার্ড নেই। করোনা সময় খুব কষ্টে দিন কাটিয়েছি, এখনো ভিক্ষা করে খাই। টিকা নেয়ার ইচ্ছে আছে কিন্তু ব্যবস্থা তো সরকার করেনি। আমরাও করোনা থেকে বাঁচতে চাই।
মুন্সিগঞ্জ থেকে ১৫ বছর আগে আসা স্বপ্না হিজড়া দীর্ঘদিন বসবাস করছেন আমবাগান রেলবিট সংলগ্ন বস্তিতে। গান-বাজনা করেই জীবিকা নির্বাহ করা এই হিজড়া এনআইডি কার্ড পেয়েছেন নারী হিসেবে গত বছর।
করোনা টিকা নেবেন কিনা জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘আমি হিজড়া, আমাকে এনআইডি কার্ড দিয়েছে নারী হিসেবে। আমার এত বন্ধু রেখে আমি কীভাবে টিকা নেব? আমরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। কয়েকটি এলাকায় আমরা দলবদ্ধ হয়ে থাকি। হিজাড়া হিসেবে টিকা না পেলে আমি নারী হিসেবে টিকা কেন নিব? সরকার সুযোগ না দিলে করোনায় মরে যাব।’
চট্টগ্রামে তৃতীয় লিঙ্গের এই জনগোষ্ঠীর মানুষদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা ‘বন্ধু’ সোশ্যাল ওয়েল ফেয়ার সোসাইটির চট্টগ্রামের মিডিয়া ফোরামের আহ্বায়ক সাংবাদিক স্বরূপ ভট্টাচার্য বলেন, ‘চট্টগ্রামে আনুমানিক প্রায় পাঁচ শ’র অধিক হিজড়া রয়েছে। এদের টিকাগ্রহণের সুযোগ দেওয়া মানবিক দায়িত্ব সরকারের। যদিও ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এরপরও তারা ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত হতে পারেনি তৃতীয় লিঙ্গের হিসেবে। যার ফলে তারা টিকা নিতে পারছে না। তবে তারা টিকা নেয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী।’
হিজড়াদের টিকাদানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আমাদের কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। করোনা টিকার প্রথম ধাপের বিষয়টি শেষ হলেই আমরা এ বিষয়টি গুরত্বসহকারে বিবেচনায় আনব। কারণ এনআইডি ছাড়া তো তো টিকা প্রদানের সুযোগ নেই। টিকাগ্রহণের পূর্বশত এনআইডি। এটি ছাড়া নিবন্ধনও সম্ভব নয়। তবে আমরা তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষদের করোনা টিকাদানের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।’
জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ডা. সুশান্ত বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, চিকিৎসা যদি মৌলিক অধিকার হয়, করোনা টিকা পাওয়াটাও মৌলিক অধিকার। এনআইডি না থাকার কারণে যদি তারা করোনা টিকা থেকে বঞ্চিত হয় এটি অমানবিক ও বৈষম্য। করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে সবার টিকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘এনআইডি না থাকলেও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের বিশেষ ব্যবস্থায় টিকা গ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মাধ্যমে প্রত্যায়নপত্র দিয়ে হিজড়াদের টিকার আওতায় আনা যেতে পারে।’
