নিজ দলের নেতাকর্মী এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর রাজধানীর বনানী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচ টি ইমামকে। গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ঘুরিয়ে এনে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে গুলশানের আজাদ মসজিদে জানাজার পর প্রধানমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক উপদেষ্টার মরদেহ নেওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সেখানে ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সন্ধ্যার আগে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে গতকাল সকালে হেলিকপ্টারে উল্লাপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয় এইচ টি ইমামের কফিন। সেখানে উল্লাপাড়া আকবর আলী সরকারি কলেজ মাঠে তার প্রথম জানাজা হয়। সেখান থেকে বেলা দেড়টার দিকে মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আনা হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সেখানে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তার কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
কিডনির জটিলতাসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগে গত বুধবার রাত সোয়া ১টায় রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য এইচ টি ইমাম।
তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এইচ টি ইমামের কফিনে এ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। করোনা পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি। তাদের পক্ষে নিজ নিজ সামরিক সচিব শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এসএম সালাহ উদ্দিন ইসলাম বীরপ্রতীক এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী এইচ টি ইমামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস কমোডর এসএম নাঈম রহমান।
আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মুকুল বোস, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ প্রমুখ। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বেলা দেড়টায় নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলির জন্য এইচ টি ইমামের মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান চলে। বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত চলা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এইচ টি ইমামের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সেখানে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।
এইচ টি ইমামের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তার মতো কর্মপাগল ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ সমাজে বিরল। দেশের জন্য অনেক কাজ করে গেছেন এইচ টি ইমাম। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন, কিন্তু কাজ থেকে কখনো অবসর নেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে ছিলেন এইচ টি ইমাম। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার কন্যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি আমাদের দলের প্রচার সেলের প্রধান ছিলেন।’
সিরাজগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে প্রথম জানাজা : এইচ টি ইমামের প্রথম জানাজা হয়েছে সিরাজগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে। উল্লাপাড়া সরকারি আকবর আলী কলেজ মাঠে গতকাল দুপুর ১২টায় এ জানাজা হয়। এর আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সর্বস্তরের জনগণ তাকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।
এইচ টি ইমামের ছেলে সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস, জেলার ডিসি ফারুক আহাম্মদ, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কেএম হোসেন আলী হাসান, উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফয়সাল কাদের রুমী উল্লাপাড়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম জানাজায় ছিলেন।
জানাজা শেষে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এইচ টি ইমামের মরদেহ হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নেওয়া হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় উল্লাপাড়ায় তার গ্রাম সোনতলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হেলিকপ্টারে মরদেহ আনা হয়।
এইচ টি ইমামের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা। তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করা এইচ টি ইমাম ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকারের চাকরিতে থাকা অবস্থায় পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এইচ টি ইমাম। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিবও হন তিনি।
হোসেন তৌফিক ইমামের জন্ম ১৯৩৯ সালে, পরে তিনি এইচ টি ইমাম নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। বাবার চাকরি সূত্রে তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জেলায়। ম্যাট্রিক পাস করেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে। ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে। রাজশাহী কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি নিয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি নেন। তখন তিনি বাম ছাত্র সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন রাজশাহী সরকারি কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে। এরপর পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিপরিষদের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত সাভারের লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি যোগাযোগ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিবও হন।
অবসর নেওয়ার পর আওয়ামী লীগে সক্রিয় হন এইচ টি ইমাম। দলের নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান ছিলেন, যে কমিটির চেয়ারম্যান শেখ হাসিনা।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে উপদেষ্টার দায়িত্ব দেন। প্রথমে তিনি জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। ২০১৪ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে এইচ টি ইমামের রচিত কয়েকটি গ্রন্থকে বেশ গুরুত্ব দেন গ্রন্থ সমালোচকরা।
এইচ টি ইমাম নিজে নির্বাচনে না দাঁড়ালেও তার ছেলে তানভীর ইমাম সিরাজগঞ্জের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য।
