করোনা মহামারী শুরুর পরপরই ব্যাংক খাতে কর্মী ছাঁটাই নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক কর্মীর বেতনও কমেছে। এছাড়া দেড় শতাধিক ব্যাংককর্মী মারাও গেছে। এত কিছুর পরও ২০২০ সালে ব্যাংকে পুরুষকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে কমেছে নারীকর্মীর সংখ্যা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে নারীকর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৭৮ জনে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে নারীকর্মীর সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার ৪৮০ জন। সেই হিসেবে এক বছরে ব্যাংকে নারীকর্মী কমেছে ১০২ জন।
পরিসংখ্যান ঘেঁটে আরও দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে পুরুষকর্মীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৫০ জন। তখন ব্যাংককর্মীদের মধ্যে নারীকর্মীর হার ছিল ১৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ৫৯টি ব্যাংকে পুরুষকর্মীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮২৮ জন। নারীকর্মীর হার ছিল ১৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ আলোচ্য বছরে ব্যাংকে নারীকর্মী কমলেও পুরুষকর্মী আগের মতো না বাড়ায় নারীকর্মীর অংশগ্রহণের হার বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট প্রতি ছয় মাস পরপর ব্যাংকে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের তুলনামূলক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
হালনাগাদ করা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে নারীকর্মীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি। ২০২০ সাল শেষে এ খাতের ব্যাংকগুলোতে নারীকর্মীর অংশগ্রহণ ছিল ৩২ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে নারীকর্মীর হার ছিল ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে এই হার ছিল ১৮ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকে নারীকর্মীর হার সবচেয়ে কম, ১৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
মোট নারীকর্মীর ৬৩ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে, ২৭ শতাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে, ৭ শতাংশ বিশেষায়িত ব্যাংকে এবং ৩ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকে।
আলোচ্য সময়ে ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম ছিল, মাত্র ১২.২০ শতাংশ। এর মধ্যে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে নারী পর্ষদ সদস্যের অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি (১৭.৩৯ শতাংশ), রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে নারী পর্ষদ সদস্যের অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে কম, ৭ শতাংশ।
কর্মক্ষেত্রে উচ্চ পর্যায়ের (৯.১৬ শতাংশ) তুলনায় মধ্যবর্তী (১৫.৩৭ শতাংশ) ও প্রারম্ভিক (১৫.৯১ শতাংশ) পর্যায়ে নারী কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের হার বেশি। অর্থাৎ ব্যাংক খাতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রারম্ভিক পর্যায়ে বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে অনেকেই ঝরে পড়ে।
এ বিষয়ে ট্রাস্ট ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়রা আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মনে হয় উচ্চ পর্যায়ে বা মধ্যবর্তী পর্যায়ে নারীকর্মীর অংশগ্রহণ কমে যায় না। তারা অন্যান্য ব্যাংকে চাকরি বদল করে চলে যায়।’
তাছাড়া, উচ্চ পর্যায় বা মধ্যবর্তী পর্যায়ে নারীর থেকে পুরুষদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় বলে ব্যাংকে নারীরা পিছিয়ে পড়েন বলে মনে করেন উচ্চ পর্যায়ের নারী ব্যাংক কর্মকর্তা।
আলোচ্য সময়ে তফসিলি ব্যাংকগুলোতে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী কর্মকর্তাদের (৮.৪০ শতাংশ) চেয়ে অনূর্ধ্ব ত্রিশ বছর বয়সী নারী কর্মকর্তাদের (২০.৬২ শতাংশ) অংশগ্রহণের হার প্রায় দ্বিগুণের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোতে কর্মরত নারী কর্মকর্তাদের কর্মসংস্থান বদলের হার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নারীকর্মীদের কর্মসংস্থান বদলের হার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, বিশেষায়িত, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নারীদের তুলনায় বেশি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও নারীকর্মীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোট জনবলের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ ছিল নারী।
প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কমর্চারীদের জন্য একটি অনুকূল কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা ও প্রতিষ্ঠানের সর্বক্ষেত্রে লৈঙ্গিক সমতা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ২০১১ ও ২০১৩ সালে আলাদা আলাদা নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকগুলো তাদের নারীকর্মীদের বিভিন্ন ধরনের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়ে থাকে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি ছয় মাস পরপর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগ।
সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের মহাব্যবস্থাপক খন্দকার মোর্শেদ মিল্লাত বলেন, জাতিসংঘের ২০১৫ সালের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের ১৭টির মধ্যে একটি ছিল লৈঙ্গিক সমতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ওই গোলটিকে লৈঙ্গিক সমতা অর্জন এবং সকল ক্ষেত্রে নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই গোল-এর অধীনে মোট ৯টি টার্গেটে নারী এবং মেয়েদের প্রতি সব ক্ষেত্রে সমান সুবিধা দিয়ে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক খাতে এই সুযোগ করে দিতে এ ধরনের প্রতিবেদন করে এবং তা পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।’
