জাতীয় পর্যায়ে জয়িতা হলেন বীরাঙ্গনা রবিজান

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২১, ০৩:১৪ পিএম

‘যুদ্ধের সময় ম্যালা নির্যাতনের শিকার হইছি। যুদ্ধের পরও ম্যালা অপমান আর অবহ্যালার মধ্যে দিন কাটায়ছি। কেউ আমার খবর রাখে নাই। আজ আমার জমি হইছে, সরকারি খাতায় নাম উঠছে, সরকার মাসে মাসে ভাতাও দিতেছে, আবার ঘরও পামো শুনছি। আজকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে পুরস্কার দিবো বইল্যা ডাকছে। এইসবই হইছে মির্জাপুরর সাংবাদিকগো জন্যে। তারা আমারে নিয়া পেপারে লেখছে তাই আমি সরকারের নজরে পরছি।

কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল ইউনিয়নের বীরাঙ্গনা রবিজান বেওয়া।

মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের বিভীষিকার যন্ত্রণা চাপা দিয়ে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করায় এ বছর জাতীয় পর্যায়ে ঢাকা বিভাগে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

তিনি বাঁশতৈল ইউনিয়নের বাঁশতৈল পশ্চিমপাড়া গ্রামের হারাদন আলীর মেয়ে।

৮ মার্চ সোমবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পাঁচজন জয়িতাকে এক লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সনদ দেয়া হয়। এদের মধ্যে মির্জাপুরের বীরাঙ্গনা রবিজান একজন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একদিন পাকবাহিনী রবিজান বেওয়াদের গ্রামে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিএসসিসহ আরও কয়েকজনের বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ওই দিনই পাক বাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে রবিজানসহ আরও কয়েকজন নারীকে ধর্ষণ করে। অস্ত্রের ভয় আর গণধর্ষণের কারণে জ্ঞান হারান তিনি।

ধর্ষণের শিকার হওয়ার কারণে স্বামীর সংসার ছাড়তে হয় তাকে। সরকারি জমিতে ঘর তুলে বসবাস করতে থাকেন তিনি। বয়স হওয়ায় এখন কানেও শোনেন না তেমন, স্মৃতিশক্তিও কমে গেছে। স্বাধীনতার এত বছর পরে এসেও রবিজান বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাননি।

এ ছাড়া বয়স্ক বা বিধবা ভাতা বা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধাও পাননি তিনি।

উল্টো পেয়েছেন মানুষের লাঞ্ছনা, ঘৃণা, অপবাদ আর গলাধাক্কা। কাজ করতে না পারায় খেয়ে না খেয়ে কাটছে বৃদ্ধা রবিজানের দিন।

২০১৬-১৭ সালে রবিজানকে নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে স্বচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়। খবরটি তৎসময়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারীর নজরে আসে।

পরে তিনি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. মাহাবুব হোসেনকে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।

পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে রবিজানকে ঢেউটিন ও নগদ টাকা প্রদান করেন।

এ সময় প্রত্যন্ত তৃণমূল থেকে খোঁজ করে একটি সত্য ঘটনা পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ করায় স্থানীয় সাংবাদিকদের ধন্যবাদও জানান তিনি।

এর আগে ওই খবরে তাৎসময়ের মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম আহমেদে রবিজানকে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড, কম্বল ও বিছানার চাদর প্রদান করেন।

 দীর্ঘ যাচাই বাছাই শেষে ২০১৯ সালের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৬২তম সভায় ৯ জুলাই রবিজান বেওয়াসহ সারা দেশে ৪৬ জন বীরাঙ্গনার নাম প্রকাশ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যা ২৯ জুলাই গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

২০১৯ সালের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান বীরাঙ্গনা রবিজান। একই বছর ১৫ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে রবিজানকে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার ৮২ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়।

এছাড়া গত বছর রমজান মাসে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জোবায়ের হোসেন বীরাঙ্গনা রবিজানকে সরকারি ৮ শতাংশ ভূমি লিখে দখল বুঝে দেন।

রবিজান বলেন, সাংবাদিকরা আমাকে নিয়ে লেখার কারণে দীর্ঘদিন পর হলেও বীরাঙ্গনা খেতাব, সম্মানী ভাতা ও সরকারি জমি পেয়েছি। আজ শেখ হাসিনা আমাকে পুরস্কার দিলেন। এ জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মির্জাপুরের সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জোবায়ের হোসেন বলেন, গেজেট প্রকাশের দিন থেকে তার নামে ভাতা চালু হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সরকারি ৮ শতাংশ ভূমি লিখে ও দখল বুঝে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারিভাবে তাকে ঘর দেয়ার প্রস্তুতি চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত