উম্মতের প্রতি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ছিল অতুলনীয় ভালোবাসা। উম্মতের প্রতি মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসার কথা বর্ণনা করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রাসুল এসেছেন, যিনি তোমাদের বিপন্নতায় কষ্ট পান, তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’ (সুরা : তাওবা : ১২৮)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, এ বিষয়ে, ‘তোমাদের কাছে এসেছেন তোমাদের মধ্য থেকে এক মহামর্যাদাবান রাসুল, যিনি তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপথগামী হওয়ায় খুবই উদ্বিগ্ন এবং সৎকর্মের প্রতি ধাবমান হওয়ার বড়ই আশাবান। তিনি মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল দয়ালু।’ (সুরা : তাওবা : ২২৮)
নবী করিম (সা.) দোয়ার সময় সর্বদা উম্মতের কথা স্মরণ করতেন। সবার জন্য তার মন থাকত ব্যাকুল। তাই প্রতিদিন প্রত্যেক নামাজের পর উম্মতের গুনাহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন তিনি। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘রাসুল (সা.)-এর অন্তর প্রসন্ন দেখলে আমি বলতাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার জন্য দোয়া করুন।’ তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আয়েশার আগে ও পরের, গোপন ও প্রকাশ্যে করা গুনাহ ক্ষমা করুন।’ রাসুল (সা.)-এর দোয়া শুনে আয়েশা (রা.) হেসে নিজের কোলে মাথা নিচু করে ফেলতেন। তার হাসিমাখা মুখ দেখে রাসুল (সা.) বলতেন, ‘আমার দোয়ায় কি তুমি আনন্দিত হয়েছো?’ আয়েশা (রা.) বলতেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এটা কেমন কথা, আপনার দোয়ায় আমি আনন্দিত হব না?’ তখন রাসুল (সা.) বলতেন, ‘আল্লাহর শপথ, এভাবেই আমি প্রত্যেক সালাতের পর আমার উম্মতের জন্য আমি দোয়া করি।’ (ইবনে হিব্বান : ৭১১১)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সব নবীর এমন কিছু দোয়া আছে, যা আল্লাহর কাছে কবুল হয়। সব নবী দ্রুত নিজেদের জন্য দোয়া করেছেন। আমি তা কিয়ামতের দিন উম্মতের সুপারিশের জন্য গোপন করে রেখেছি। আমার উম্মতের মধ্যে যে আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছু শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে ইনশাআল্লাহ আমার সুপারিশ লাভ করবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৯৯)
আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুলন আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইবরাহিম (আ.)-এর কথা তিলাওয়াত করলেন, ‘হে আমার রব, তারা অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে, তাই যারা আমার অনুসরণ করবে তারা আমার দলভুক্ত, আর যারা আমার অবাধ্য হবে (তাদের ব্যাপারে) আপনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৩৬)
আর ঈসা (আ.) বলেছেন, আপনি তাদের আজাব দিলে তারা আপনার বান্দা, আর ক্ষমা করলে আপনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ১১৮)
অতঃপর রাসুল (সা.) দুই হাত তুলে বলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মত! আমার উম্মত!’ আল্লাহতায়ালা বললেন, ‘হে জিবরাইল, মুহাম্মদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো, আপনি কাঁদছেন কেন?’ মহান আল্লাহ সবকিছুই অবগত আছেন। জিবরাইল (আ.) এসে জিজ্ঞেস করলেন। রাসুল (সা.) তাকে নিজের কথা বললেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে জিবরাইল, তুমি মুহাম্মদের কাছে গিয়ে বলো, আমি শিগগির আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করব এবং আমি আপনাকে কষ্ট দেব না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২০২)
আমরা মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত। আর মুহাম্মদ (সা.) উম্মতের সব বিষয়ে খেয়াল রাখতেন। উম্মতের ক্ষতিকর বিষয়সমূহ হলো যে, তার বিপদ, ত্রুটিমুক্ত আমল, পার্থিব জীবনে সুখময়ভাবে জীবন পরিচালনা করা, পরকালীন সব ক্ষতিকর ও অনিষ্টকর বিষয় থেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন সারা জীবন।
রাসুল (সা.) উম্মতদের বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য অবিরাম চেষ্টা করছেন। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে রাসুল (সা.) সব সময় ভাবতেন যে, কীভাবে মানুষদের অন্যায়-অবিচার কাজ থেকে বিরত রাখা যায়। নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন তার উম্মতের সার্বিক কল্যাণের জন্য।
রাসুল (সা.) গুনাহগার উম্মতের প্রতি বিশেষ স্নেহশীল ছিলেন। উম্মতের অনাগতদের প্রতি রাসুল (সা.)-এর ছিল তীব্র ভালোবাসা। কেননা তারা না দেখেই রাসুলের জন্য সাক্ষ্য দেবে। তাই তাদের দেখার বাসনা ছিল তার। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ইচ্ছা করছে।’ সাহাবিরা বললেন, আমরা কি আপনার ভাই নই? রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা তো আমার সাহাবি তথা সঙ্গী। আমার ভাই হলো, যারা আমার ওপর ইমান আনবে; কিন্তু আমাকে দেখবে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১২৭১৮)
উম্মতের সবার পক্ষ থেকে রাসুল (সা.)-এর কোরবানি ছিল ভালোবাসার চূড়ান্ত নমুনা। তিনি পুরো মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে নিজেই কোরবানি করতেন। আবু রাফে (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) কোরবানির সময় দুটি মোটাতাজা ও শিংঅলা দুম্বা কিনতেন। নামাজ আদায় করে খুতবা দিতেন। অতঃপর তিনি নামাজের স্থানে দাঁড়ানো থাকতেই একটি দুম্বা নিয়ে আসা হতো। তা নিজ হাতে ছুরি দিয়ে জবাই করে বলতেন, ‘হে আল্লাহ, এটা আমার পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে, যারা আপনার তাওহিদের সাক্ষ্য দিয়েছে এবং আমার রিসালাত পৌঁছে দেওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২৭৭৮২)
মুহাম্মদ (সা.) সব সময় উম্মতের জন্য পেরেশান ছিলেন। বদরের যুদ্ধে ৩১৩ জন সাহাবি যখন যুদ্ধ করতে গেলেন, তখন প্রিয়নবী মহান প্রভুর দরবারে তার সাহাবিদের জন্য দোয়া করলেন; হে আল্লাহ! এই সাহাবিরা আমার অনেক আদরের; এই সাহাবিদের তুমি মেরো না, এদের তুমি রক্ষা করো। উহুদে রাসুল (সা.)-এর দাঁত ভেঙেছে, মাথা ফেটেছে, খন্দকের যুদ্ধে মাটি বহন করতে করতে নিজ শরীরে দাগ হয়ে গিয়েছে; তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তায়েফের দুষ্ট ছেলেরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ঠাট্টা করেছে, গালমন্দ করেছে, তারা রাহমাতুলিল আলামিনের ওপর কঙ্কর নিক্ষেপ করেছে। তবু তিনি এসব হাসিমুখে সহ্য করেছেন উম্মাহের সার্বিক মুক্তির জন্য।
মুমিনদের প্রতি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিশয় স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। মানবজাতি কোনো দুঃখ-কষ্টে লিপ্ত হবে এবং আজাব-গজবে পড়বে এটা সহ্য করতে পারতেন না। এ কথার প্রমাণ স্বয়ং কোরআন মজিদে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন : ‘তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল, তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার পক্ষে সহ্য করা দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়। (সুরা : তাওবাহ : ১২৮)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ায় উম্মতকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা-ফিকির করে শেষ করেছেন এমন নয়, বরং তিনি আখিরাতেও গুনাহগার উম্মতকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করবেন।
