করোনা মহামারী শুরুর পর স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে অনেকেই ই-কমার্স সেবার মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীসহ বিভিন্ন দ্রব্য কেনাকাটায় ঝুঁকে পড়েন। ব্যাংকের কার্ডধারীদের মধ্যে এ প্রবণতা উল্লেখযোগ্য।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী লেনদেনের অঙ্কের দিক দিয়ে করোনার বছরে কার্ডে ই-কমার্সে কেনাকাটা বেড়েছে ১১৮ শতাংশ। অর্থাৎ ই-কমার্সে আগের থেকে দ্বিগুণেরও বেশি কেনাকাটা করছেন ব্যাংকের গ্রাহকরা। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্ডের মাধ্যমে ই-কমার্সে পণ্য কিনে ৫ হাজার ১৪২ কোটি টাকা মূল্য পরিশোধ করেছেন কার্ডধারীরা।
অন্যদিকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্ডের মাধ্যমে ই-কমার্সে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে লেনদেন বেড়েছে ২ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সচেতন মানুষ ই-কমার্সে নির্ভরতা বাড়াতে থাকেন। এর ফলে পুরো ই-কমার্স খাতেই লেনদেন বাড়তে থাকে। তবে টাকার অঙ্কে ই-কমার্সে লেনদেন দ্বিগুণ বাড়লেও সংখ্যার দিক দিয়ে কার্ডে কেনাকাটা খুব একটা বাড়েনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালে কার্ডের মাধ্যমে ই-কমার্সে ১ কোটি ৯৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৪১ বার কেনাকাটা করেছেন গ্রাহকরা। এর আগের বছরে কার্ডের মাধ্যমে ই-কমার্সে ১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭ হাজার ৫০৭ বার কেনাকাটা করেন এর গ্রাহকরা। সেই হিসাবে লেনদেনের সংখ্যার দিক দিয়ে কার্ডে ই-কমার্সে কেনাকাটা বেড়েছে ২০ শতাংশ। তবে কার্ডে ই-কমার্সের কেনাকাটার এই প্রবৃদ্ধিতে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না এ খাতের সংগঠন ই-ক্যাবের নেতারা।
তারা বলছেন, লেনদেনের সংখ্যা খুব একটা না বাড়লেও লেনদেনের অঙ্ক বাড়ার অর্থ হলো আগের থেকে গ্রাহকরা বেশি টাকার পণ্য ই-কমার্সের মাধ্যমে কিনছেন। তবে করোনা মহামারীর মধ্যে ই-কমার্স খাতের কেনাকাটা কয়েক গুণ বেড়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, ই-ওয়ালেট সেবাসহ ব্যাংক চেকেও কেনাকাটা হচ্ছে। তাছাড়া নগদ টাকা দিয়েও পণ্য ডেলিভারি নিচ্ছেন ক্রেতারা। সেই হিসেবে কার্ডে ই-কমার্স কেনাকাটার প্রবৃদ্ধি অনেক কম বলেই তাদের ধারণা।
এ বিষয়ে ই-ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনায় ই-কমার্সের লেনদেন কী হারে বেড়েছে সেই তথ্য এখনো আমাদের হাতে আসেনি। তবে এ খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন করোনার মধ্যে তাদের কেনাকাটা বহুগুণে বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ই-কমার্স সেবার একটি বড় লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল ট্রানজেকশন বাস্তবায়ন করা। ব্যাংকের কার্ডের মাধ্যমে ই-কমার্স লেনদেন এখনো প্রত্যাশার থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। তবে মোবাইল ব্যাংকিং বা ই-ওয়ালেট সেবার মাধ্যমে ই-কমার্সের লেনদেন বাড়ছে। তবে এ-সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করে না। ফলে শুধু কার্ডের মাধ্যমে ই-কমার্স লেনদেনের তথ্য দিয়ে এ খাতের পুরো চিত্র প্রতিফলিত হবে না।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ই-কমার্সের তথ্য প্রকাশ করতে কোনো বাধা নেই। এ বিষয়ে ই-ক্যাব থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তারা।
ই-ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন বলেন, বর্তমানে ই-কমার্সভিত্তিক অনেক ধরনের লেনদেন হচ্ছে যা লেনদেনের হিসাবের মধ্যে দেখানো হচ্ছে না। এ ধরনের লেনদেনকে আমরা ই-কমার্স ইকোসিস্টেমস বলছি।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ই-কমার্সের পণ্য ডেলিভারি করার পর কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের খরচও ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে। তা ছাড়া ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রমোশনের খরচও ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের জোগানদাতাদেরও মূল্য পরিশোধ করছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। এইসব লেনদেনের তথ্য ই-কমার্স খাতের লেনদেনের মধ্যে আসার দরকার রয়েছে। তাহলে এই খাত ডিজিটাল লেনদেনকে কতটা বেগবান করেছে তার পুরো চিত্র ফুটে উঠবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের মে মাস থেকে কার্ডে ই-কমার্সে লেনদেনে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দেয়। ওই মাসে কার্ডে ই-কমার্সের পেমেন্ট ২৫৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৫০ কোটি টাকা হয়। এরপর থেকে প্রতি মাসেই কার্ডে ৫০০ কোটি টাকার বেশি পেমেন্ট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেমেন্ট হয়েছে জুলাই মাসে, ৬৪০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে কার্ডে ই-কমার্সের পেমেন্ট হয়েছে ৫৭৯ কোটি টাকা।
