দেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে ১০-১২টি বিষয়ে কঠোর হওয়ার সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; বিশেষ করে আগামী এক সপ্তাহ সংক্রমণ পরিস্থিতি দেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনে করছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিসিএস, এসএসসি, এইচএসসি, মাদ্রাসা, দখিলসহ যেকোনো পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে, তবে কোনোভাবেই এসব পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে যেন স্বাভাবিক সময়ের মতো লোকসমাগম না হয়; বিশেষ করে ঈদের ছুটি সংকোচনের ওপর জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তর মনে করছে, ঈদের ছুটি লম্বা হলে মানুষ বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যায়। রোগের বিস্তার ঘটে।
এ ছাড়া কাঁচাবাজার, গণপরিবহন, শপিং মল, মসজিদ-মন্দির, রাজনৈতিক সমাগম, ওয়াজ মাহফিল ও ভোট অনুষ্ঠান সীমিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। আসন্ন রোজার মাসে ইফতার পার্টি ও তারাবির নামাজ যেন সীমিত আকারে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে করা হয়, সেদিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে।
এখন থেকে সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের মিটিং ভার্চুয়াল করার সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পাশাপাশি করোনা রোগীদের আইসোলেশন জোরদার করা, রোগীর সংস্পর্শে আসা লোকজনদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন, বিদেশ থেকে আসা যেকোনো ব্যক্তিকে ১৪ দিনের কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা ও এ ব্যাপারে সামরিক বাহিনীর সহায়তা নেওয়া, স্বাস্থ্যবিধি মানাতে প্রয়োজনে আইন জোরদার করা, পোর্ট অব এন্ট্রিতে জনবল বাড়ানো ও মনিটরিং জোরদার করা এবং পর্যটন এলাকায় চলাচল সীমিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, হঠাৎ করে করোনার সংক্রমণ বেড়ে গেছে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগে যেসব নির্দেশনা ছিল, সেই ১০-১২টা নির্দেশনা সরকারকে আবার দিয়েছি বাস্তবায়ন করার জন্য। কারণ স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে বেশ শৈথিল্য দেখা দিয়েছে। এ রকম অবস্থা চলতে থাকলে সামনে বিপদ হতে পারে।
এর আগে গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বর্তমান করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে কেন সংক্রমণ হচ্ছে, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, রোগটি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের শৈথিল্য দেখা যাচ্ছে ও করণীয় জানতে সবার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়। পরে সেসব পরামর্শ লিখিত আকারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
লকডাউনের সুপারিশ নেই : করোনা সংক্রমণ বাড়লেও এখনো লকডাউন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, লকডাউন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। লকডাউন দেওয়ার মতো কোনো পরিপ্রেক্ষিত এখনো তৈরি হয়েছে, এটা মনে হয় না। বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ না করে এ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। কারণ লকডাউন অনেক বড় বিষয়। এটার সঙ্গে অর্থনীতি, জীবন-জীবিকা জড়িত।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, সভা-সমাবেশ, যেকোনো বৈঠক, এগুলো যেন সীমিত করা হয়। গণপরিবহন, শপিং মল, মসজিদ, মন্দির, রোজার মাসে যেসব ইফতার পার্টি হয়, সেগুলো যেন সীমিত রাখা হয়, বেশি জনসমাগম না হয়।
তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরও এক সপ্তাহ পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী এক সপ্তাহ পরিস্থিতি দেখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্কুল-কলেজ খোলার ব্যাপারে বিবেচনা করে দেখবে। আমরা তো সিদ্ধান্ত দিতে পারব না। আমরা বলেছি, আগামী এক সপ্তাহ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে। তবে লকডাউনের ব্যাপারে কোনো আলোচনা হয়নি।
এই কর্মকর্তা বলেন, বিসিএস পরীক্ষাসহ পাবলিক পরীক্ষা সাবধানে নেওয়ার জন্য বলেছি। পরীক্ষার্থীর সঙ্গে যেন বেশি লোকজন না আসে, সেদিকে নজর রাখতে বলেছি। একজন বাচ্চার সঙ্গে চারজন করে আসে। প্রায় ৩৫ লাখ থেকে ৪০ লাখ লোক হয়। পরীক্ষা বন্ধ ও স্কুল-কলেজ খোলার ব্যাপারেও কিছু বলিনি।
মহাপরিচালক বলেন, ঈদের ছুটির ব্যাপারে বলেছি, ঈদের সময় সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে লম্বা ছুটি হয়ে যায়। সবাই বেড়াতে চলে যায়। আমরা বলেছি, সেদিকে নজর রাখতে যাতে সে রকম কিছু না ঘটে। ছুটিটা যাতে সংকোচন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেটা ঈদের আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কারণ তখন পরিস্থিতি সে রকম খারাপ না-ও থাকতে পারে।
বেশির ভাগ রোগীর ভ্রমণ ইতিহাস রয়েছে : হঠাৎ করোনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভ্রমণকে কারণ হিসেবে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে, যেসব রোগী পাওয়া গেছে তাদের কেস স্টাডি করে, নানাভাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যেটা পাওয়া গেছে, তাদের পর্যবেক্ষণ হলো এসব রোগী সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণ করেছেন। তারা কেউ কোথাও না কোথাও বেড়াতে গেছেন। যেখানে বেড়াতে গেছেন সেখানকার মানুষের সংস্পর্শে গেছেন। কক্সবাজার, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গেছেন। সেই সব জায়গা থেকে ফিরে আসা লোকজনের মধ্যে সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। এটা যদি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কমে যায় বা না বাড়ে, তাহলে বুঝব এসব লোকজন নিজেরা সংক্রমিত হয়ে আবার ভালো হয়ে গেছেন। কিন্তু সংক্রমণ যদি না থামে, ক্রমে বাড়তেই থাকে, তাহলে বুঝব ভ্রমণকারী লোকজন নিজেরা আক্রান্ত হয়েছেন এবং তার আশপাশের লোকজনের মধ্যেও ছড়াচ্ছেন। রোগী মূলত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক বেশি। এখানে জনসংখ্যা বেশি। এখানে আইন প্রয়োগ করেও কঠোর অবস্থানে যাওয়া যাচ্ছে না। মাস্ক পরা উচিত। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, মাঠে যারা কাজ করেন, কেবল তারাই মাস্ক পরছেন। বাকিরা মাস্ক পরতে আগ্রহী নয়।
এই কর্মকর্তা মনে করেন, মাস্ক যদি সবাই পরত, তাহলে এত রোগী হতো না। সংক্রমণ আবার বেড়ে গেল কেবল যাতায়াত ও অবাধ মেলামেশার কারণে। সংক্রমণের এখন যে ধারা, সেটা যদি আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়, ১০-১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, মৃত্যু যদি ২৬ জনের মতোই হতে থাকে, তাহলে অ্যালার্ট হতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোন পথে এগোতে চাইছে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনগণের অংশগ্রহণ নিয়ে যে সমস্যা, সেটার সমাধান করতে চাই। সরকারি-বেসরকারি সব শ্রেণির মানুষের সচেতনতা দরকার। গত মার্চ-এপ্রিলের দিকে যে রকম ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানাসহ বিভিন্ন কর্মকা- বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল, তারা যদি সে রকম ভূমিকাটা আবার একটু পালন করেন, আর হাসপাতালকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা যদি সবাই আবার মানুষকে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন, তা হলে আমরা আবার জানুয়ারি পূর্ববর্তী ভালো অবস্থায় যেতে পারি। কারণ এখন যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা কোন পর্যায় পর্যন্ত গেছে ও কবে নাগাদ স্বাভাবিক হতে পারে, সেটা বুঝতে দুই-চার সপ্তাহ সময় দিতে হবে। রমজান মাসকে বেশি ভয়। সেখানে ইফতার পার্টি, তারাবি নামাজ আছে। সেখানে মানুষের সংস্রব বেশি। গত বছর রোজা ও ঈদে কড়াকড়ি ছিল। সে জায়গাটায় আমরা জোর দিতে চাই।
