পত্রিকায় ছাপা হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রতিকৃতি

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২১, ০১:৫৬ এএম

পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র মিছিলের স্রোত। চলছে বাঙালির প্রতিরোধের সশস্ত্র প্রস্তুতি। শহর, পাড়া-মহল্লা, গ্রাম সবখানেই অস্ত্রের প্রশিক্ষণ, কুচকাওয়াজ। অংশ নিচ্ছে সর্বস্তরের মানুষ। তৈরি হয়ে গেছে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রতিকৃতি। আগুন হয়ে বাতাসে ভাসছে ‘জয় বাংলা’ সেøাগান। বাঙালির দৃপ্ত পদভারে দিনরাত জেগে থাকছে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বাড়িটি। বারবার উচ্চারিত হচ্ছে বাঙালির দৃপ্ত ঘোষণা বন্দুক, কামান, মেশিনগান কিছুই জনগণের স্বাধীনতা রোধ করতে পারবে না।

’৭১-এর অসহযোগ আন্দোলনের আজ ২১তম দিন, ২২ মার্চ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে চলছে বাঙালির সশস্ত্র প্রশিক্ষণ। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রতিকৃতিও তৈরি করে রেখেছিল পরিষদ। একাত্তরের এই দিন সেই রঙিন পতাকা ঢাকার সব সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে ছাপা হলো। সেই পতাকা আগামী ২৩ মার্চ তথাকথিত পাকিস্তান দিবসে বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে উত্তোলনের আহ্বান জানাল পরিষদ। সবগুলো জাতীয় দৈনিকেই আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আজ প্রকাশিত হয় বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘বাংলাদেশের মুক্তি’। সেখানে এক লিখিত বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধের দুর্গ। সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত। জয় বাংলা।’

বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত শিশু-কিশোর এবং পল্টন ময়দানে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকদের সমাবেশ ও কুচকাওয়াজে ঢল নামে মানুষের। কুচকাওয়াজের পর পল্টন ময়দানে এক বিরাট সমাবেশ করেন বাঙালি সৈনিকরা। সভাপতিত্ব করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম আই মজিদ। সভায় কর্নেল এমএজি ওসমানীও বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ চলাকালে জনতার মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনি ও হাততালিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সভা শেষে সৈনিকরা কুচকাওয়াজ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান ও সামরিক কায়দায় শহীদবেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পন করেন। শপথ নেন বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার সংগ্রামকে সর্বাত্মকভাবে সফল করে তোলার। সেখান থেকে কুচকাওয়াজ করতে করতে ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যান ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

সকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আগামী ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্ট ভবনের এক ঘোষণায় বলা হয়, ‘পাকিস্তানের উভয় অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলোচনাক্রমে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবেশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

ঢাকার রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা বৈঠক করলেন ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও বঙ্গবন্ধু। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে সোজা ধানম-ি নিজ বাসভবনে যান বঙ্গবন্ধু। সেখানে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আন্দোলনে আছি এবং লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

অন্যদিকে বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে কড়া সামরিক পাহারায় হোটেলে ফিরেই উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন ভুট্টো। বৈঠক শেষে ভুট্টোর নেতৃত্বে পিপলস পার্টির নেতারা সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। রাতে সেখান থেকে ফিরে হোটেল কন্টিনেন্টালে এক অনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন করেন ভুট্টো। সম্মেলনে বলেন, প্রেসিডেন্ট ভবনে শেখ মুজিব, ইয়াহিয়া ও আমার মধ্যে এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। শেখ মুজিবের সঙ্গে আমি আরও ফলপ্রসূ ও সন্তোষজনক আলোচনায় আগ্রহী। কারণ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রথমে আমাকে ও শেখ মুজিবকে একমত হতে হবে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’ উপলক্ষে রাতে এক বাণীতে বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মিলেমিশে একসঙ্গে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তান এখন এক ক্রান্তিলগ্নে উপনীত। গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের পথে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। তবে আমরা যদি আমাদের লক্ষ্যে অবিচল থাকি তাহলে কোনো কিছুই হারাব না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত