সপ্তাহখানেক আগে অনাবিল পরিবহন ও ভিক্টর পরিবহনের দুটি বাস বেপরোয়া গতিতে চলছিল ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে। ঢাকার ভেতরে প্রবেশের সময় একটি বাস আরেকটিকে ওভারটেক করতে এলোমেলোভাবে বাড়াচ্ছিল গতি। খিলক্ষেতে এসে সমান গতির গাড়ি দুটোর টক্কর লেগে অনাবিল বাসটি ছিটকে পড়ে উঠে গেল আইল্যান্ডে। পেছন থেকে আসা অপর একটি বাসের আঘাতে সেটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। মুহূর্তেই সাত-আট যাত্রী গুরুতর আহত হন। ওই ঘটনার মতোই রাজধানীসহ দেশের কোথাও না কোথাও চালকদের রেষারেষিতে ঘটছে ভয়ংকর সব দুর্ঘটনা। যাত্রীদের জীবন বিপন্ন করে বাস-মিনিবাসের প্রাণঘাতী প্রতিযোগিতা থামাতে কর্র্তৃপক্ষের নেই দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ।
গত তিন দিন ধরে রাজধানীর উত্তরা, মতিঝিল, পল্টন, প্রেস ক্লাব, মৎস্য ভবন, শাহবাগ, কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট, মৌচাক, মালিবাগ, মগবাজার, সায়েদাবাদ, কমলাপুর, মুগদা, বাসাবো, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা এলাকার সড়কে ঘুরে বেপরোয়া বাস চলাচলের দৃশ্য দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দুই বাসের রেষারেষিতে এমন দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও দেখার যেন কেউ নেই। রেষারেষিতে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে তাকে মামুলি দুর্ঘটনা হিসাবে বলা হচ্ছে। এটিকে স্রেফ দুর্ঘটনার ধারায় মামলা করে জড়িতদের বাঁচানো হয়। সব দেখার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ ও রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটি) কর্মকর্তাদের ভাষ্যেও ফুটে উঠেছে এক ধরনের অসহায়ত্ব। তারা বলছেন, আইনের কঠিন প্রয়োগ ও কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা না গেলে এভাবে ঝরতেই থাকবে তরতাজা প্রাণ।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ১৪১ জনের। ৪ হাজার ৯২টি দুর্ঘটনায় একই সময়ে আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৮৫ জন। তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত বছর দেশে ৪ হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৩১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৭৯ জন। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ’র হিসাবমতে, প্রতিদিন সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় ৩০ জন। সে হিসাবেও বছরে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮০০ জনে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেশে বছরে ১২ হাজার আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী ২০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যায় কিছু তারতম্য থাকলেও সড়ক দুর্ঘটনায় ভয়াবহতা নিয়ে সংশয় নেই। প্রতি বছরই স্বজনহারা হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। মূলত প্রশাসনের যথাযথ তদারকি আর অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া কার্যকলাপের কারণেই মৃত্যুর এ মিছিলে লাগাম টানা যাচ্ছে না।
নিরাপদ সড়ক চাই কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা তো অনেক দিন ধরেই চলছে। বাসচালকরা কাউকেই মানছে না। একপ্রকার ফ্রি স্টাইলে গাড়ি চালাচ্ছে। চাকায় পিষ্ট হয়ে বা ধাক্কায় কে মরল, আহত হলো তা দেখার সময় নেই। বর্তমানে চালকরা সবেচেয়ে বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আইন থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রাফিক পুলিশের গাফিলতি, উদাসীনতা ও অবহেলার কারণেই এমনটি ঘটছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গণপরিবহন চালকরা ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমঝোতা করেই ভয়ংকর প্রতিযোগিতা করে। গত তিন দিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে ঘুরে বেপরোয়া বাস চলাচলের দৃশ্য দেখা যায়। কোনো চালকই আইন মানছে না।
গতকাল গুলিস্তান-এয়ারপোর্ট রুটের বাসচালক রায়হান বলেন, সবকিছু আগের মতো চলছে। প্রতিদিন নির্ধারিত টাকা দিতে হচ্ছে বাসমালিককে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা যেকোনো প্রতিকূলতার মধ্যেও মালিককে নির্ধারিত টাকা বুঝিয়ে দিতে হয়। এ কারণে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে তাদের গাড়ি চালাতে হচ্ছে। কারণ যত ট্রিপ তত টাকা। আগে যেতে পারলেই বেশি যাত্রী পাওয়া যায়। আবার পুলিশকেও দিতে হয় টাকা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মুনিবুর রহমান বলেন, আসলে রাজধানীতে বেপরোয়া বাসচালকদের নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন। ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার বাসচালকদের বলা হচ্ছে রাস্তায় বাস চালানোর সময় কোনো প্রকার প্রতিযোগিতা চলবে না। কিন্তু চালকদের এটি শোনানো যাচ্ছে না। এজন্য আমরা কাউন্সেলিং করছি। আরও কার্যকর কী করা যায় সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বেশকিছু পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ বাসচালকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাসচালক বা অন্য কারও কাছ থেকে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা সবকিছুই নজরদারির মধ্যে রাখছি।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নানা সীমাবদ্ধতাও অবশ্যই আছে। সড়কে এনফোর্সমেন্ট তো আমরাও করি, পুলিশও করে। আমাদের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৩ জন ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে আছে ১১ জন। এছাড়া জেলায় পর্যায়ে ডিসির অধীনে ম্যাজিস্ট্রেটরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। জেল-জরিমানা হচ্ছে। ২০১৮ সালের সড়ক আইনে সর্বোচ্চ দুই বছরের সাজা দেওয়া যায়। আসলে বিআরটিএ তো একটা রেগুলটরি বডি। তিনি আরও বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরে বাকি বিভাগেও এর কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। প্রচার-প্রচারণা ও চালক-মালিকদের সচেতনতা করার মতো কাজও করতে হচ্ছে। মানুষকে সতর্ক হতে হবে। শুধু যাত্রী নয়, চালক ও মালিকও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা নিজেরাই যদি নিজের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে তাহলে তো সেটার পরিণাম ভয়ংকরই হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ গতকাল বলেন, রাজধানীতে চালকদের রেষারেষি করে বাস চালানোর বিষয়টি আমরা অবগত। এজন্য বিআরটিএকে আমরা বলেছি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চালকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে। তাছাড়া আমরা চালকের প্রশিক্ষণের বিষয়েও কাজ করছি। চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার বিষয়টি এখানে জরুরি। অনেক চালক হালকা লাইসেন্স দিয়ে ভারী গাড়ি চালাচ্ছে।
