মিছিলের শহরে নামে অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তানি সৈন্য

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২১, ০১:৩৪ এএম

একদিকে প্রহসনের বৈঠক চলছে; অন্যদিকে বাঙালি নিধনে তৈরি হচ্ছে ইয়াহিয়ার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নকশা। ঢাকার রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে যখন বৈঠকের নামে ব্যস্ত রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শকদের, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম বন্দরে নামছে বাঙালি গণহত্যায় পাকিস্তান সামরিক জান্তার অস্ত্র। বাতাসে বারুদের গন্ধ পেলেন বঙ্গবন্ধু। ডাক দিলেন স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতির।

পথে নামল বাঙালি। সামরিক জান্তার উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বললেন,‘আর আলোচনা নয়, এবার ঘোষণা চাই। আগামীকালের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নেবে বাঙালি।’ অথচ নিরপরাধ বাঙালি তখনো জানত না মাত্র এক দিন পর তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কী ভয়াবহ এক বিভীষিকাময় রাত!

আজ ২৪ মার্চ। একাত্তরের এই দিনে ক্ষোভে ফুঁসছিল উত্তাল পূর্ব পাকিস্তান। দুপুরের আগেই ঢাকা রূপ নেয় মিছিলের শহরে। অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত হয়ে পথে নামে পাকিস্তানি সৈন্যরাও। তাদের ছত্রছায়ায় ঢাকার মিরপুর, রংপুর, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে নামে অবাঙালি বিহারিরা। শুরু হয় সংঘর্ষ।

রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুরে সামরিক সরকারের এজেন্টরা বোমাবাজি করে। ঢাকার মিরপুরে চালায় উসকানিমূলক কার্যক্রম। চট্টগ্রাম ও রংপুরে জনতা-সেনাবাহিনী সংঘর্ষ হয়। সৈয়দপুরে সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় জনতার ওপর নিধনযজ্ঞ চালায় অবাঙালি বিহারিরা।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয় গোটা পূর্ব পাকিস্তানে। বাড়িতে বাড়িতে ওড়ে স্বাধীন বাংলা ও শোকের কালো পতাকা। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সশস্ত্র কুচকাওয়াজ করে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। পাকিস্তানি সৈন্যরা কেন্দ্রের কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে সন্ধ্যা থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় ঢাকা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান।

সন্ধ্যা থেকে ঢাকার মিরপুরে তাণ্ডব শুরু করে অবাঙালিরা। সাদা পোশাকধারী সেনাবাহিনীর লোকদের সহযোগিতায় জোরপূর্বক বাঙালিদের বাড়িঘর থেকে স্বাধীন বাংলার পতাকা নামিয়ে অগ্নিসংযোগ করে ও পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন করে। রাতে ব্যাপক বোমাবাজি চালিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। বাড়িঘরে আগুন দেয়। গুলি ও ছুরিকাঘাতে অসংখ্য মানুষ আহত হন।

চট্টগ্রামে নৌবন্দরে ১৭ নম্বর জেটিতে নোঙর করা এমভি সোয়াত জাহাজ থেকে ৫ হাজার ৬৩০ টন সমরাস্ত্র খালাসের প্রস্তুতি নিচ্ছিল পাকিস্তানি সেনারা। কিন্তু খালাসের আগেই বীর চট্টলার অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ ঘিরে ফেলে তাদের। বিকেলে অস্ত্র খালাসে সেনাবাহিনীর নির্দেশ অমান্য করে বন্দর শ্রমিকরা। ব্যারিকেড দেয় জেটি থেকে কদমতলী পর্যন্ত প্রায় চার মাইল পথ। অস্ত্রের মুখে এরই মধ্যে ১২টি ট্রাকে খালাস করা কিছু অস্ত্র নতুনপাড়া আনার চেষ্টা করলে ডবলমুরিং সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে ট্রাকের পথরোধ করে দাঁড়ায় জনতা। রাত সাড়ে ১০টায় জনতার ওপর গুলি চালায় পাকিস্তানি সেনারা। প্রতিরোধ করে জনতাও। শহীদ হন দুইশ শ্রমিক-জনতা।

সৈয়দপুর সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতলগাড়ি, গোলাহাট ও কুন্দুল গ্রামে শতাধিক মানুষকে হত্যা করে সেনাবাহিনী। কারফিউ দিয়ে আগুন দেয় বাঙালির বাড়িঘরে। আহত হন কয়েক হাজার। সেনাবাহিনীর গুলিতে অর্ধশত বাঙালি শহীদ হন রংপুর সেনানিবাস এলাকায়।

সকাল ও সন্ধ্যায় রমনার প্রেসিডেন্ট ভবনে দু’দফা বৈঠক হয় আওয়ামী লীগ ও সরকারের পরামর্শকদের মধ্যে। বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, আওয়ামী লীগের বক্তব্য শেষ। প্রেসিডেন্টের উচিত তার ঘোষণা দেওয়া। আওয়ামী লীগ আর কিছুতেই আলোচনা দীর্ঘায়িত করবে না। বিকেলে একে একে ঢাকা ত্যাগ করতে থাকেন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা। ছোট ছোট পার্লামেন্টারি দলের নেতাদের পাশাপাশি করাচির উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যান ভুট্টোর সফরসঙ্গী ১৩ জনের ৭ জনই।

চট্টগ্রাম, রংপুর, সৈয়দপুর ও মিরপুরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গভীর রাতে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা নস্যাৎ করার উদ্যোগ নেওয়া হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত