মুক্তচিন্তা ও স্থিতিশীল গণতন্ত্রের প্রত্যাশা

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২১, ১১:০৪ পিএম

মানুষের অবস্থা এই বাংলাদেশে আজ আদৌ কিছু পাল্টালো কি না তা একটু-আধটু বোঝার চেষ্টা করি। জীবন ধারণের ও জীবিকা-নির্বাহের কোনো বিস্তারিত ভাষ্য নয়, কেবল কিঞ্চিৎ তথ্য-নির্দেশের ইঙ্গিত মাত্র।

দুটো বিষয় আমাদের নজরে আসে। ১. সাক্ষরতার হার দ্রুততার সঙ্গে বাড়ছে; এবং ২. এখানে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু একটা সন্তোষজনক জায়গায় এর ভেতরেই পৌঁছে গেছে। সাক্ষরতার হার বাড়ার সঙ্গে কিন্তু ভবিষ্যতে আমাদের সম্ভাব্য বিপন্নতারও একটা যোগ আছে। তা নইলে ১৯-শতকে বিদ্যাসাগরের ও বিশ শতকের গোড়ায় বেগম রোকেয়ার ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করার উদ্যোগ দীর্ঘদিন সমাজে তৃণমূলপর্যায়ে কোনো সুফল দেয় না কেন? ১৯৭৪-এ এসেও পাঁচ বছরের বেশি বয়সের জনসংখ্যায় এখানে সাক্ষরতার হার ছিল শতকরা ২৪.৩। মেয়েদের বেলায় মাত্র ১৪.৮। পরের দশ বছরে ওই হার বাড়েনি বরং কমেছে। কিন্তু এই সাক্ষরতার হার এখন শতকরা ষাটের কাছাকাছি। মেয়েদের ভেতরেও তা শতকরা পঞ্চান্নর ওপরে। পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ১০০ ভাগ ছাড়িয়েছে। তুলনায় বেশি বয়সের ছেলেমেয়েরাও প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকায় এই হার ১০০-এর ওপর এবং মেয়েদের ভেতরেও এই হারে কোনো তফাত নেই।

এখন যে অক্ষমরাও ছেলেমেয়েদের শিক্ষার দিকে নজর দিচ্ছেন (যাতে দু-দশক আগেও তাদের অবহেলা ছিল প্রাচীরতুল্য) তার নেপথ্যে প্রধান কারণ হিসেবে যা চোখে পড়ে তা হলো, তারা বুঝতে পেরেছেন যে ঐতিহ্যনির্ভর পারিবারিক বৃত্তিতে টিকে থাকার নিশ্চয়তা আর মেলে না। সেই সঙ্গে কাজের বাজারে ঢুকতে হলে জ্ঞানভিত্তিক কোনো বিদ্যার বিকল্প নেই। তবে ছেলেমেয়েদের পড়ানোর আপেক্ষিক ব্যয় কিন্তু অক্ষম পরিবারেই বেশি। তা সত্ত্বেও নিরুপায় হয়েই তারা অনমনীয় এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছেন। কাজের বাজার যথেষ্ট সম্প্রসারণশীল হয়ে ওঠেনি। হয়ে উঠতে পারবে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই। কারণ, বাইরের উপকরণ পাওয়ার শর্তগুলোও বিবেচনা করতে হয়। তাতে পরিস্থিতি সবটা আমাদের হাতে থাকে না। অনেক যোগ্য প্রার্থী, কিন্তু পদ অল্প। অনিবার্য আকাক্সক্ষা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকলেই ছেলেমেয়েরা কাজ পেয়ে যাবে, এমনটা ভাবা আজ আকাশকুসুম কল্পনা। অনেক সময় তাদের ন্যায্য যোগ্যতাও অন্যের ক্ষমতার পাশা খেলার অন্যায় শিকার হয়ে পড়ে। এ রকম পরিস্থিতিতে উপরি দাঁও মারার প্রবণতা শিক্ষা-ব্যবসায়ের মাতবরদের ভেতরেও ছড়ায়। কর্মকুশলতায় বা কর্মবিনিয়োগে কোনো বাড়তি আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। অন্যদিকে মূল্যবোধের অবক্ষয় আমাদের ভরসার জায়গাগুলো নড়বড়ে করে দিতে থাকে। এটা কিন্তু শিক্ষার পরিবেশটাই দূষিত করে তোলে। উচ্চশিক্ষায় ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী-কর্মকর্তা চাক বেঁধে সুবিধা পাওয়ার ফাঁকফোকরগুলো কাজে লাগাতে নানা রকম অশুভ পাঁয়তারায় নামার প্রবণতা দেখা যায় সবার ভেতরেই। শিক্ষার পরিবেশ গোল্লায় যায়। যদিও প্রাথমিক প্রয়োজন হিসেবে শিক্ষায় স্বীকৃতির ছাপটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্যান্য কল-কারখানার আদর্শগত ও কার্যগত ব্যবধান কমে আসে। ফাউ-খাওয়া ফন্দিবাজরা এখানেও শেকড় গজিয়ে দামামা বাজায়। অশুভ অস্থিরতা একটা তৈরি হয়। তার প্রভাব পড়ে সব প্রতিষ্ঠানেই।

দ্বিতীয় বিষয়টির দিকে আমরা এখনো খুব একটা নজর দিইনি। এ দেশে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু এখন সত্তর ছাড়িয়েছে। ১৯৯২-তে ছিল ৫৬ দশমিক ৩। নারী-পুরুষে বিভেদ তখনই দূর হয়েছে। একাত্তরে জীবন-প্রত্যাশার এই মান ছিল চল্লিশ বছরের কোটায়। আগে আরও কম। পেনিসিলিনের আবিষ্কারের পর তার সুফল এ দেশে আমরাও পেতে শুরু করেছি। পাশাপাশি কলেরা, জলবসন্ত ইত্যাদি মহামারী দূর করা গেছে। শ্রমের বাজারে এর প্রভাব যে খুব বেশি পড়েছে তা নয়। কিন্তু অসহায়-পরনির্ভর জনসংখ্যার অনুপাত বাড়ছে এবং তারা যে টিকে থাকছে, কোথাও-কোথাও পারিবারিক ও সামাজিক মূল্য সৃষ্টিতে সহায়ও হচ্ছে, এতে একটা বিষয় অনুমান করা যায় : নৈর্ব্যক্তিকভাবে বার্ধক্যের অনুপাত বেড়ে গেলেও তা সমাজে কোনো ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে না। জাতীয় উৎপাদনে তাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনও মিটছে এবং তা মোট জনসংখ্যার চাপ অসহনীয় পর্যায়ে চলে যেতে থাকলেও। এটা আমাদের অর্থনীতিতে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধিরই ইঙ্গিত দেয়।

তবে আমাদের বাজারের প্রতিষ্ঠানগুলো সচল থাকলেও, তারা যে যথেষ্ট সবল এ কথা বলা যায় না। ইউরোপ-আমেরিকায়ও তারা এক দিনে গড়ে ওঠেনি এবং কোথাও তারা পূর্ণতা পায়নি। পাবেও না। কারণ মানুষের অবিরাম প্রতিশ্রুতিশীল জীবনযাত্রাই তা হতে দেবে না। নতুন সম্ভাবনা নতুন সমস্যারও জন্ম দেয়। তাদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে, এমনকি সমঝোতা করতে-করতেও বাজারের এগোনো; সমাজেরও। কল্যাণকামী অর্থনীতিবিদরা নানা সময়ে নানা বাস্তব ভারসাম্যহীনতার গভীরতর অসুখের মুখোমুখি হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন, সংশোধনের পথ বাতলেছেন। মানুষ সেসবে সাড়া দিয়েছে। বাজার নিরাময়ের পথ খুঁজে পেয়েছে। অবশ্যই চিরস্থায়ী নয়। কারণ বাস্তব এক বিন্দুতে স্থির থাকে না। আবার সংশোধনের দরকার পড়ে।

এগুলো আমাদের জানা। সমস্যার প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের কথাও। কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে নৈর্ব্যক্তিক, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করা এক দিনের ব্যাপার নয়। সমাজের ভেতরে কায়েমি স্বার্থের বিভিন্ন চক্রের যে দ্বন্দ্ব তা-ও তাতে ঢুকে পড়ে। সুযোগ পেলে ব্যক্তিস্বার্থও। তাদের প্রকোপ তুলনায় আমাদের মতো দুর্বলতর বাজারেই বেশি। তাদের ক্ষতিকারী প্রভাবও। শক্ত-পোক্ত বাজার অন্য সুযোগ সৃষ্টি করে। অন্য জটিলতাও। যোগাযোগের পথে তারা আমাদেরও রেহাই দেয় না। কিন্তু মৌলিকভাবে বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল থেকে গেলে ‘নেপোয় দই মারার’ সুযোগ পায়। অহরহ ঘটেও তাই। তবু বাজার আমাদের অকার্যকর হয়ে পড়েনি। সার্বিক অর্থনীতির গতিমুখ আমরা চিনতে পারি। সেই সঙ্গে সম্পদ বণ্টনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও।

অনেকে মনে করেন, বাজার যখন ঝামেলা পাকায়, তখন ঝেঁটিয়ে বিদায় করো তাকে। প্রভুর একনায়কতন্ত্র বা গণমানুষের সমাজতন্ত্র, দুটো দিকই তা নির্দেশ করতে পারে। একনায়কতন্ত্রের বিকার ও বীভৎসতা আমাদের অজানা নয়। ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের পরোক্ষ আঘাত ছাড়াও আমরা নিজেরাই পড়েছি তার কবলে দীর্ঘকাল স্বাধীনতার আগে, এমনকি স্বাধীনতার পরেও। তাদের দাঁতের দাগ বাজার দেহের ওপর থেকে সহজে যাওয়ার নয়। বৈষয়িকভাবে শুধু নয়, মানসিকভাবেও আমরা পঙ্গুত্বের শিকার হই।

গণমানুষের সমাজতন্ত্র ধারণাগতভাবে শোষণের উচ্ছেদ ঘটায়। কিন্তু প্রক্রিয়াগত ব্যবস্থার সার্থক রূপ এখনো গড়ে ওঠেনি। শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের অমার্জিত-অতিরিক্ত সুবিধাভোগ (যা হয়ে ওঠে ফাউ-খাবার উৎকট উদাহরণ) ও ঝুঁকি নেওয়ার অব্যবস্থা একে স্থবিরতার দিকে ঠেলে। আমাদের তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুদৃঢ় করা এবং বাজারকে স্বচ্ছ, পরস্পরনির্ভর ও গতিশীল রাখার কার্যকর নিয়মাবলির নৈর্ব্যক্তিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না।

এটা ঠিক, বাজারে মুদ্রাব্যবস্থার সম্প্রসারণ বণ্টনে স্থিতিশীল কোনো অবস্থার নিশ্চয়তা দেয় না। ব্যাংকব্যবস্থায় তারল্যের সুষ্ঠু ব্যবহার বিনিয়োগেও গতি আনে এবং তা কর্মসৃজনের পথ খোলা রাখে। অবশ্য তা নিয়ন্ত্রণেরও সামষ্টিক ব্যবস্থা থাকা চাই। তারপরও বাজারের হাত ধরেই মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নিত্য ওঠানামা। আর এই চঞ্চলতার পেছনে ছুটেই তার সমাজকে আরও সৃষ্টিক্ষম করার প্রয়াস পাওয়া। টাকা বানানো, টাকা হারানো; দুটোর সম্ভাবনাই তাতে একই রকম থেকে যায়। এমনকি পুরোপুরি নিরাসক্ত ও নৈর্ব্যক্তিক হলেও। সমাজে এর প্রতিফলন ঘটে। বনেদি পরিবার বা বনেদি সংস্কৃতি বলে মান্যতা পাওয়ার দিন ফুরিয়ে যায়। মানুষের মেধা ও কর্মদক্ষতা যদি প্রাথমিক গুরুত্ব পায় এবং অন্য বিবেচনা যদি পিছু হটে, তবে এটা অগ্রগতিরই সহায়ক। আমাদের বাজারব্যবস্থা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছায়নি। তবু তার প্রয়োজনীয়তার কথা আমাদের মাথায় রাখতে হয়। গতিশীল সমাজ সবার জন্যই ওপরে ওঠার পথ খুলে দেয়। বাজারই তার অবলম্বন। বিচ্যুতি যদি ঘটে তবু এবং বিচ্যুতি যাতে না ঘটে, তা দেখাও বাজারের দায়িত্ব।

তবে আজকাল অনেক বহুরূপী এখানে ঘাঁটি গাড়ছে। অ্যাডাম স্মিথের যৌক্তিক ছাঁচকে উলটে দিয়ে তারা সবাইকে বোঝাতে চাইছেন, সামাজিক বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তিগত লাভের বদলে গ্রাহককে ভালো করাই তাদের রক্ষ্য। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে যারা কপর্দকহীন, বিশেষ করে মেয়েরা, তাদের ঋণ দিয়ে ওই অর্থের সদ্ব্যবহার করে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন তারা তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেন। এটা যে সফল উদ্যোগ এবং মহৎ উদ্যোগ এই বলে এখানে সবাই কিছু বোঝার আগেই বিদেশে কাড়া-নাকাড়া বাজতে থাকে। আমরা অভিভূত হই। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় হিসাব করতে গিয়ে দেখি, বার্ষিক সুদের হার গিয়ে দাঁড়ায় শতকরা তিরিশের ওপর। আগে মহাজনি প্রথায়ও এই সুদের গড় বার্ষিক হার ছিল শতকরা ২৭। বেশির ভাগ গ্রামবাসী প্রয়োজনে ধার চাইত প্রথমে বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজনের কাছে। বাজারব্যবস্থার বাইরেই তার ফয়সালা হতো। অধিকাংশই অল্প সুদে, এমনকি বিনাসুদে। ধার নিয়ে তা বিনিয়োগ করে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন অবশ্য তখন কারও মাথায় কেউ ঢোকায়নি।

পাশ্চাত্যে কোথাও অর্থলগ্নি করে এত সুদ মেলার সম্ভাবনা সুদূর। প্রশাসনিক ব্যয় বাদ দিলেও হাতে যা থাকে, তা যথেষ্ট লোভনীয়। তাই দারিদ্র্য বেচার ব্যবসায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উৎসাহী সহযোগী পেতে অসুবিধা হয় না। উদ্যোগ ফুলে-ফেঁপে দিগি¦দিকে ছড়ায়। এরই পথ ধরে দেশে জাঁকিয়ে বসে এনজিও ব্যবসা। অধিকাংশই গরিবের মাথায় কাঁঠাল ভাঙার। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারী আসে সব শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থেকে। বরং বাইরের প্রচ্ছদে শোভা পায় দেশ সেবার-গরিবের সেবার লেখাচিত্র।

এ ব্যবসা সরকারি নয়, সাধারণ মানুষেরও নয়। তাদের ভেতরে-বাইরের যোগাযোগে শুলুক-সন্ধানে যারা দক্ষ, তারাই পায় এই স্বপ্নলোকের চাবি। লায়েক হয়ে উঠলে সরকারকেও থোড়াই কেয়ার করা চলে। অথবা নিজেরাই সরকারকে ওঠবস করার ফিকিরে থাকে। লেজ মোটা হলে সরকারও কদাচিৎ তাদের ঘাঁটাতে চায় না। কারণ স্বার্থচক্রের সঙ্গে যোগাযোগের একটা রাস্তাও তারা বাতলায়। ওদিকে উত্তর-আধুনিক তত্ত্ববাজরা বুলি ঝাড়ে, রাষ্ট্র কাঠামো ও রাষ্ট্র-কর্তৃত্ব যতদূর পারো, ছেঁটে ফেলো। তবেই মিলবে সত্যিকারের স্বাধীনতা। আমাদের মতো দেশে তার অর্থ দাঁড়ায়, মাৎস্যন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। এর প্রভাব পড়ে বাজারে, প্রভাব পড়ে জনমত সংগঠনে, যেমন পড়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কারবারে দালাল-মুৎসুদ্দি ও ফিচেল লুম্পেনদের উত্থানে। মুক্তচিন্তার ধারায় স্থিতিশীল গণতন্ত্রই কেবল পারে তার মোকাবিলা করতে। বাজারের বিকার দূর করার লড়াইতেও সেইটিই প্রকৃষ্ট উপায়। তবে রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যদি কবজা করে নেয় আদর্শগতভাবে যারা তার শত্রু, তারাই তবে দুর্ভোগের কোনো সীমা থাকে না। কী আমাদের দেশে, কী ইউরোপ-ল্যাটিন আমেরিকায় তার ভয়াবহ পরিণাম ইতিহাস বারবার দেখেছে। এখানে গণমানুষের মতি-গতির ওপরই শুধু ভরসা। তা যদি বিগড়ে যায়, তাহলে আর কিছু করার থাকে না। পতনই তখন অনিবার্য নিয়তি। সাধারণ অগ্রগতির ভেতরেও মানুষের ইতিহাসে বিচ্ছিন্নভাবে নানা জায়গায় তার উদাহরণ কম নয়।

এ ছাড়া একটি মৌলিক আশঙ্কা থেকে যায়। জনসংখ্যা আমাদের এখন ষোলো কোটির ওপর। এর চাপ আমরা এখন পর্যন্ত সামলেছি। কিন্তু তা যখন বিশ কোটি ছাড়াবে, তখন অবস্থা কী দাঁড়াবে? এটা উনিশ শতক নয়। বিশ শতকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের অবস্থাও নয়। তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ২০০ কোটি। এখন তা ৭০০ কোটি ছাড়িয়েছে। ফাঁকা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে অবস্থা সামলাব, তার সম্ভাবনা মিলিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের দেশেও প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে জনসংখ্যার ভারসাম্য অনেকখানি ক্ষয় পেয়েছে। নদী-নালা শুকিয়ে যাচ্ছে। ছেলেমেয়েদের খেলার জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষে-মানুষে মানবিক সহমর্মিতা নষ্ট হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তন বিরূপ প্রভাব ফেলছে। প্রযুক্তির বিস্ময় দিয়ে এদের অপঘাত আমরা কত দিন-কতদূর ঠেকিয়ে রাখব? ম্যালথুসিয়ন না হলেও প্রশ্নটির সদুত্তর খুঁজে পাই না। তার তত্ত্বের প্রেক্ষাপট নিয়ে সংশয়ের জবাবে জন মেইনার্ড কেইন্স্ যে বলেছিলেন, ‘ইন দ্য লং-রান উই আর অল ডেড্’ তাতেও কোনো শান্তি মেলে না। শিরে সংক্রান্তিই মনে হয়।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সাবেক সদস্য এবং শিক্ষাবিদ ও লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত