কৃষিতে বাংলাদেশের নীরব বিপ্লব

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২১, ১১:২৬ পিএম

ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তার ইচ্ছে ছিল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার। তিনি বলতেন, ‘এই স্বাধীন দেশে মানুষ যখন পেট ভরে খেতে পাবে, পাবে মর্যাদাপূর্ণ জীবন; তখনই এই লাখো শহীদের আত্মা শান্তি পাবে।’ সে কারণেই স্বাধীনতার পর তিনি ডাক দিয়েছিলেন সবুজ বিপ্লবের এবং কৃষিকে দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কৃষকের মঙ্গলের কথা ভেবে তিনি ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেছিলেন। পাকিস্তান আমলের ১০ লাখ কৃষকের নামে দায়ের করা সার্টিফিকেট মামলা  প্রত্যাহার এবং সুদসহ সমুদয়

কৃষিঋণ মওকুফ করে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ভালোভাবেই জানতেন কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়; সম্ভব নয় তার স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তবায়ন। কৃষির কাক্সিক্ষত উন্নয়নের জন্য এ পেশায় মেধাবী মানুষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাই কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজে মেধাবী ছাত্রদের আকর্ষণ করতে তিনি

কৃষিবিদদের সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করেন।

কৃষিকাজে জনগণের অধিকতর সম্পৃক্ত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে জাতীয় কৃষি পুরস্কার প্রবর্তন করেন।

বঙ্গবন্ধু কৃষি উন্নয়ন, কৃষি গবেষণা ও আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনসহ নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এতে কৃষিবিষয়ক শিক্ষা ও প্রযুক্তিচর্চায় মেধা আকর্ষণের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, পঁচাত্তরের আগস্ট ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশ আর সে ধারায় অগ্রসর হতে পারেনি।

তবে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে অদ্যাবধি বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ অনুসরণ করে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষিক্ষেত্রে বেশ কিছু বাস্তব ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার লক্ষ্যে সারের দাম ৫ দফা কমিয়ে প্রতিকেজি টিএসপি ৮০ থেকে ২২ টাকা, এমওপি ৭০ থেকে ১৫ টাকা, ডিএপি ৯০ থেকে ১৬ টাকায় নির্ধারণ। সার, ডিজেল, বিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতে আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত এসব খাতে মোট ৮১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা  দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন বাবদ ১০৪ কোটি ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান। কৃষকদের মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়ায় ১ কোটি ৭ লাখ ৩৭ হাজার ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব হয়েছে।

২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে বর্তমান সরকার প্রণোদনা/কৃষি পুনর্বাসন চালু করেছে। অদ্যাবধি এ কর্মসূচির মাধ্যমে ১০৪২ কোটি ৪৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে ৯৮ লাখ ২৫ হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছেন। ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার লক্ষ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে দেশের হাওর ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় কৃষকের জন্য ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকার জন্য ৫০ শতাংশ হারে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৪২২ কোটি ৮০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে কৃষিতে অর্জিত হয়েছে অভাবনীয় সফলতা।

ফসলের জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে প্রথম। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ২০টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত বাংলাদেশ পেরিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সফলতার সঙ্গে আবাদ হচ্ছে। সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়, চাল উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে সপ্তম ও আম উৎপাদনে অষ্টম। এভাবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের কৃষিতে যেমন সফলতা ও সম্ভাবনা আছে, তেমনি রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাসহ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জগুলো হলো এক. শস্য রোপণ, পরিচর্যা ও কর্তনকালে কৃষি শ্রমিকের অভাব। দুই. কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের অনিশ্চিয়তা। তিন. কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাব। চার. ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থা। পাঁচ. উত্তম কৃষিচর্চার অভাব। ছয়. কৃষিতে বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততা। সাত, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব ইত্যাদি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়  সরকারের পক্ষ থেকেই প্রাথমিক উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে বেসরকারি খাতকেও।

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো কৃষিপণ্যের জাতীয় মূল্য কমিশন গঠন করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুরক্ষার জন্য কৃষিবীমা চালু করতে হবে এবং বীমার প্রিমিয়াম ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বহন করতে হবে। মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল ক্রয়ের পরিবর্তে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সরকার নির্ধারিত মূল্যে উৎপাদিত ধানের কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ধানের মূল্য মোবাইল ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের দিতে হবে। এতে কৃষক উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং সরকারি খাদ্যশস্য ক্রয়ে দুর্নীতি বহুলাংশে হ্রাস পাবে। এ ছাড়া অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিদেশে রপ্তানির ব্যাপারেও গ্রহণ করতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।কৃষিতে বাজেট বরাদ্দ, প্রণোদনা আরও বাড়াতে হবে এবং প্রণোদনার সুফল যাতে প্রকৃত কৃষক পান সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে।

বর্তমানে দেশের প্রায় ৫ কোটি লোক নগরে বসবাস করে। ২০২০ সালে ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৮.৫ কোটি লোক এবং ২০৫০ সালে দেশের শতভাগ লোক অর্থাৎ ২১ কোটি ৫০ লাখ লোক নগরে বসবাস করবে। তখন গ্রাম বলে কিছুই  থাকবে না। শহরের সব সুবিধাই পৌঁছে যাবে গ্রামে। নগরই হবে মানুষের স্থায়ী ঠিকানা। তাই এখন থেকেই গ্রামীণ কৃষির পাশাপাশি নগরবাসীর প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য, ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, মাংস নগর-মহানগর ও তার আশপাশে উৎপাদনের জন্য পরিবেশবান্ধব নগরীয় কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় দেশের দূর-দূরান্ত থেকে খাদ্য পরিবহন করে অথবা বিদেশ থেকে খাদ্যসামগ্রী আমদানি করে নগরবাসীর খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। সম্ভব হবে না নগরবাসীর দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা।

আজ থেকে ৫০ বছর আগে বাংলাদেশের অবস্থা এ রকম ছিল না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। খাদ্য উৎপাদন হতো ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। সে খাদ্য দিয়ে দেশের মানুষের তিন বেলা পেট পূর্তি হতো না। খাদ্যের জন্য বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সে সময় দেশি আউশ ও আমনের চাষ হতো বেশি। বিলের নিচু এলাকায় সামান্য পরিমাণ জমিতে হতো বোরো ধানের চাষ। ফলন ছিল খুব কম। বিঘায় ৩ থেকে ৪ মণ। চৈত্র-বৈশাখ মাসে কত লোক মিষ্টিআলু খেয়ে দিন কাটাত তা বলে শেষ করা যাবে না। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের কৃষি, মৎস্য ও  প্রাণিসম্পদ খাতে এক নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এ বিপ্লবের সূচনা করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরিপূর্ণতা দেন তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের অক্লান্ত পরিশ্রমী কৃষক, মৎস্যচাষি এবং পোলট্রি ও গো-খামারিরা এ বিপ্লবের নায়ক। এ নীরব বিপ্লবে কৃষি ও প্রাণিবিজ্ঞানীদের নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকাও কোনো অংশে কম নয়।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লি.

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত