মুক্তিযোদ্ধা-সংগীতশিল্পী সুজেয় শ্যাম ১৯৪৬ সালের ১৪ মার্চ সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। দশ ভাইবোনের মধ্যে সুজেয় ষষ্ঠ। মা-বাবাও ছিলেন নজরুল সংগীত শিল্পী। ছোট বোন, ভাইও বেতারে গাইতেন। সুজেয় শ্যাম গিটার বাদক ও শিশুতোষ গানের পরিচালক হিসেবে ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম বেতারে যোগ দেন। পরে বড়দের অনুষ্ঠান পরিচালনা শুরু করলেও ১৯৬৮ সালে ঢাকা বেতারে চলে আসেন। স্বাধীন দেশে কাজ করেছেন বাংলাদেশ বেতারে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ বেতার থেকে প্রধান সংগীত প্রযোজক হিসেবে অবসরে যান। কাজ করেছেন চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসেবেও। ‘হাছন রাজা’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা তাকে প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দেয়। সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি তিনি এই চলচ্চিত্রের একটি গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। পরে ‘জয়যাত্রা’ ও ‘অবুঝ বউ’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে ২০০৪ ও ২০১০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। সংগীতে শিল্পকলা পদক পান ২০১৫ সালে, একই বছর পান স্বাধীনতা সম্মাননা ও ভারত গৌরব সম্মাননা। ২০১৮ সালে পান একুশে পদক। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন সুজেয় শ্যাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি উম্মুল ওয়ারা সুইটি
দেশ রূপান্তর : স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হলো, আপনি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সক্রিয় যোদ্ধা ছিলেন। এখন কেমন লাগছে সেই সময়ের কথা ভেবে?
সুজেয় শ্যাম : আমি প্রথমেই স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ ৩০ লাখ শহীদের প্রতি এবং যে মা-বোনেরা নির্যাতিত হয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এলে যার নামটি সবার আগে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। বেঁচে থাকার তো কথা ছিল না। সেই মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছি এবং দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বেঁচে আছি এটা অনেক বেশি ভালো লাগার। ভালো লাগছে বন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ক্ষমতায়। না হয় হয়তো এভাবে সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হতো না। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর মতো এমন শক্তিশালী নেতা না থাকলে এ দেশ স্বাধীন হতো না। তিনি বেঁচে থাকলে দেশ আরও অনেক আগেই এগিয়ে যেত। স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে অংশ নিইনি; কিন্তু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে থাকার সুবাদে সব সময় যুদ্ধের খবরাখবর পেয়েছি। নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছি এটাই শ্রেষ্ঠ ভালোলাগা। এই ভালো লাগার কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।
দেশ রূপান্তর : কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন? তার সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের পার্থক্য কতটা?
সুজেয় শ্যাম : আমরা তো মুক্তি চেয়েছিলাম, স্বাধীন দেশ চেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর দুর্বার নেতৃত্বে সেই স্বাধীনতা খুব অল্প সময়েই পেয়েছি। যদিও এর জন্য অনেক বেশি রক্ত দিতে হয়েছে। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তবে কষ্ট হয় এখনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিরা আস্ফালন করে। তারা সাম্প্রদায়িক উসকানি দিতে সব সময় তৎপর। তবে আমি আশাবাদী এই দেশে কখনোই সাম্প্রদায়িক শক্তি জায়গা করতে পারবে না। আমাদের রক্তের প্রতিটি কণায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঘর। এখানে সব ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণি-পেশার মানুষ এক সঙ্গে উৎসব করে। তাদের দুঃখ ও সুখ ভাগাভাগির করে নেওয়ার মন আছে। তবে তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে কোনো অপশক্তি আমাদের চেতনাকে আঘাত করতে পারবে না।
দেশ রূপান্তর : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ক্ষণে যে গান লেখা হয়েছিল ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’এই গানের সুর করেছেন, একেবারেই অল্প সময়ে। এই বিখ্যাত গান এবং সুরের উৎস সম্পর্কে জানতে চাই।
সুজেয় শ্যাম : ১৬ ডিসেম্বর সকাল। প্রতিদিনের মতো কলকাতার বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অফিসে আমি গেলাম। আমরা জানি না কিছুই। আমি সেদিন অন্য একটা গানের রিহার্সেল করছিলাম। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আশফাক ভাই আমাকে বললেন এই গান হবে না। বিজয়ের গান গাইতে হবে। আশফাকুর রহমান খান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রোগ্রাম অর্গানাইজার ছিলেন। বললেন, আজ আর অন্য কোনো গান নয়। সব বাদ। আজ আমাদের বিজয়ের গান করতে হবে। নতুন গান লাগবে। আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। কী হচ্ছে? হঠাৎ বিজয়ের গান। তবে আমি কোনো প্রশ্ন করিনি। শুধু বললাম, নতুন গান কোথায় পাব? শহীদুল ইসলামকে (গীতিকার) বলেন, উনি লিখে দেবেন। আমি তড়িঘড়ি করে ফিরে এলাম। গীতিকার শহীদুলকে বললাম দ্রুত একটি দ্রুত একটি বিজয়ের গান লিখে দেন। শহীদুল কিছুক্ষণের মধ্যেই গানের স্থায়ীটুকু লিখে আমার হাতে দিলেন। কোনো গান হাতে পেলেই আমি নিজেই মনে মনে গেয়ে সুর করতে থাকতাম। এটাও তাই শুরু করলাম। সমস্যা হলো সুর করব কীসে। হারমোনিয়াম নেই আমার ভাগে। হারমোনিয়ামে অন্যরা কাজ করছে। হারমোনিয়াম খুঁজতে খুঁজতে মুখে মুখে সুর তোলার চেষ্টা করছি। সুর কিছুটা আয়ত্তে এসে গেছে। এই সময় হারমোনিয়াম পাওয়া গেল। স্থায়ী অংশের সুর হয়ে গেল। এরমধ্যে শহীদুল ইসলাম দ্রুত অন্তরা দুটি লিখে ফেললেন। সুর শেষ, শুরু হলো মহড়া। গানের মুখটা সুর করার মধ্যেই চিন্তা করলাম এই গানের নেতৃত্ব অজিত রায় দিলে ভালো জমবে। সময় নেই। অজিত রায়কে গিয়ে বললাম, এই গানে আপনাকেই লিড দিতে হবে। তিনি রাজি হলেন। মহড়াকক্ষে চলে গেলাম। সমবেত কণ্ঠে আরও ছিলেন রথীন্দ্রনাথ রায়, প্রবাল চৌধুরী, তিমির নন্দী, রফিকুল আলম, মান্না হক, মৃণাল কান্তি দাস, অনুপ ভট্টাচার্য, তপন মাহমুদ, কল্যাণী ঘোষ, উমা খান, রূপা ফরহাদ, মালা খুররমসহ আরও অনেকে। এখন অনেকের নাম হয়তো মনে পড়ছে না। তবলা সংগত করেছিলেন অরুণ গোস্বামী, দোতারায় অবিনাশ শীল, বেহালায় সুবল দত্ত, গিটারে ছিলেন রুমু খান। যাদের নাম মনে নেই, তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সব মিলিয়ে মাত্র দেড় ঘণ্টা সময় লাগল। মহড়া শেষে গানটি রেকর্ড হলো।
দেশ রূপান্তর : গানটি যখন রেকর্ড হয় তখন কি জানতেন দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে? বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের তখন কী অবস্থা?
সুজেয় শ্যাম : মহড়া কক্ষেই সবার চোখেমুখে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু কেউই প্রকাশ্যে কিছু বলেনি। কারণ আমরা খুব অর্ডার ফলো করতাম। কর্মকর্তা যেভাবে অনুষ্ঠান সাজাতেন সেভাবেই আমরা কাজটা করার চেষ্টা করতাম। আমরা বসে আছি। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এলেন মুজিবনগর সরকারের চার নেতাসৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান। তাদের কাছেই জানতে পারলাম, ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি হানাদাররা আত্মসমর্পণ করেছে। তখন তো আমরা কী বলব বুঝতে পারছি না। সবাই আনন্দে কাঁদছি। আমার মনে পড়ে গেল সেই ৭ মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলি তুলে দেওয়া নির্দেশনা। আবেগে আত্মহারা বেতার কেন্দ্রের সবাই। একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে।
দেশ রূপান্তর : সেই গান কীভাবে সম্প্রচার হলো?
সুজেয় শ্যাম : গান রেকর্ড হওয়ার পর ওই দিন বিকেল ৪টায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন। এর পরপরই অজিত রায়ের নেতৃত্বে সমবেত কণ্ঠে রেডিওতে বেজে ওঠে একটি গান ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ/ খুশির হাওয়া ঐ উড়ছে/বাংলার ঘরে ঘরে/মুক্তির আলো ঐ ঝরছে’। বিজয়ের মুহূর্তে রচিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত শেষ গান ছিল এটি। এরপর যে যার মতো কী করল বলতে পারব না। এ গানটিই ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শেষ আর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গান। গানটি ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর দিনভর বাজানো হয়েছিল। কষ্টের বিষয় হলো বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিজয়ের গানটি স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘ ২১ বছর বাজানো হয়নি। লিখা ও সুর করায় ১৫ মিনিট আর মহড়া রেকর্ডিংয়ে এক ঘণ্টা সোয়া ঘণ্টা লেগেছে গানটিতে।
দেশ রূপান্তর : যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরা আর তারপর কেমন কেটেছে সময়?
সুজেয় শ্যাম : দেশে ফেরার আনন্দ তো হবেই। সংক্ষেপে এটিই বলব, মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বপ্ন নিয়ে হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে বেরিয়েছিল সেই স্বপ্ন পূরণ করেই যোদ্ধারা দেশে ফিরেছে। এ আনন্দ অন্য রকম। সবকিছু থেকে আলাদা। কষ্টের বিষয়টা শুরু হলো খুব তাড়াতাড়ি। একটা ঘোর আর মোহের মধ্যে থাকতে থাকতেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো সপরিবারে। জানেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত, মানে ’৭৫-এর পর থেকে ২১ বছর এদেশে ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ গানটি বাজেনি, ‘জয় বাংলা’ বাজেনি। স্বাধীনতার কোনো গান বাজেনি। স্বাধীনতার গান দোষটা কী করেছে? বঙ্গবন্ধুর নামও নেওয়া যায়নি এদেশে।
বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ আমাকে উজ্জীবিত করেছিল। আমি সেদিন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে যাই। অবাক হয়ে যাই। একজন মানুষের নেতৃত্বের শক্তি এত প্রবল। যার এক আঙুলের ইশারায় লাখ লাখ মানুষ নীরব হয়ে যায়। তাকিয়ে থাকে কী নির্দেশনা দেবেন। আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিই মূলত বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণেরসেই আহ্বানের তীব্র আকর্ষণ থেকে। এভাবে কোনো মানুষ বলতে পারে, কোনো মানুষ দেশকে এভাবে ভালোবাসতে পারেতা আমার অনুভূতিতে ছিল না। ওইদিন থেকেই আমার মনে হয়েছে যে, আমরা আলাদা একটা জাতি; আমাদের আলাদা একটা সত্তা আছে।
দেশ রূপান্তর : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত হলেন কীভাবে?
সুজেয় শ্যাম : ২৫ মার্চ কালরাতে ছিলাম সিলেট শহরে। একটা চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সেদিন রাতে আওয়ামী লীগের একজন নেতার মাধ্যমে জানতে পারলাম ঢাকার অবস্থা ভালো না। ইপিআর ক্যাম্পসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করেছে পাকিস্তানিরা। সারা দেশে তারা বর্বরতা চালিয়ে হত্যা করেছে নিরীহ বাঙালিদের। এরপর ৭৬ ঘণ্টা কারফিউ শেষে ২৮ মার্চ সিলেট শহরে বেরিয়ে দেখি শুধু লাশ আর লাশ। মানুষ মরা গন্ধ। জুন মাসের ৮ কিংবা ৯ তারিখে আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিই। বালিগঞ্জের দোতলা বাড়িটার একটা রুমে সংবাদ, নাটক, কথিকা, সংগ্রামী গান সবকিছুর রেকর্ডিং হতো। ছোট্ট একটা স্টুডিও ছিল, একটা পর্দা দেওয়া। ভাঙা একটা টেপ রেকর্ডার আর দুটি মাইক্রোফোন দিয়ে আমরা ২৫/৩০ জন গান করতাম।
দেশ রূপান্তর : দেশ রূপান্তরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। পাঠকদের জন্য কিছু বলুন।
সুজেয় শ্যাম : আমি তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানাব কারও কথা না শুনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানুন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলো গেয়ে তরুণ প্রজন্ম তা বাঁচিয়ে রাখবে। তাদের হাতেই আমরা আগামীর স্বপ্ন তুলে দিলাম। এই সময়ে এসে আমাদের স্মরণ করার জন্য দেশ রূপান্তর পরিবারকে আমার ধন্যবাদ জানাই।
