সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের হাতের স্পর্শ পাওয়া সরোদটি পুড়ে গেছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আলাউদ্দিন খাঁর হাতে লেখা চিঠি, ব্যবহৃত নানা সামগ্রী, দুর্লভ ছবি।
মঙ্গলবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরাতন জেল রোড এলাকায় ঐতিহ্যবাহী সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে গিয়ে দেখা গেছে, দগ্ধ জনপদের ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটি। গেটের ভেতর পড়ে আছে চেয়ার-টেবিলের পোড়া ছাই আর রড। মিলনায়তনে ঢুকলে চোখে জল আসবে। ছাই হয় গেছে প্রতিষ্ঠানটি চেয়ার-টেবিল-কাপড়, পর্দা। ফ্লোর, দেয়ালও আগুনের কালো হয় গেছে। এখানে-সেখানে পড়ে আছে সাদা পাউডার। পুরাতন ভবনের ইট-সুরকির পলেস্তারা আগুনের তাপে খসে পড়েছে। ছাদের টিন জ্বলে গেছে।
পূর্ব পার্শ্বের ভবনের প্রতিটি কক্ষে গিয়ে দেখা গেছে পড়ে আছে পোড়া ছাই। প্রতিটি কক্ষে ঢুকেই আগুন দেওয়া হয়েছে। অফিস রুমেরও তছনছ অবস্থা। ধ্বংস আর লুটপাটের চিহ্ন সর্বত্র। প্রশিক্ষণ কক্ষের ও স্টোর কক্ষের পড়ে আছে নানা বাদ্যযন্ত্রের পোড়া অংশ।
সোম ও মঙ্গলবার দিনভর শত শত সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাংস্কৃতিক সংগঠক পুড়ে যাওয়া সুর সম্রাট আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন দেখতে এসেছেন। অনেকেই এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আতঙ্কে আঁতকে উঠেছেন অনেকে। সেখানে উপস্থিত মানুষ ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রিয় সংগীত প্রতিষ্ঠানটি দেখে চোখের পানি আটকাতে পারেননি। অনেকে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তাদের একটাই বক্তব্য, বারবার কেন এই প্রতিষ্ঠানটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
রবিবার হেফাজতে ইসলামের হরতালের দিন তাণ্ডব চালানো হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরাতন জেল রোডের প্রতিষ্ঠানটিতে। এর আগে ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এবারের ঘটনা ছিল ভয়াবহ।
তারা জানান, এবার প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি কক্ষ বেছে বেছে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি কক্ষের মধ্যে একটি জাদুঘর, তিনটি ক্লাস রুম, মুক্ত আলোচনার সরোদ মঞ্চ, প্রশাসনিক কক্ষ ও স্টোর রুমে থাকা বাদ্যযন্ত্র, চেয়ার-টেবিলসহ অন্যান্য আসবাব ভেঙে তছনছ করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
ঝিলমিল শিশু-কিশোর সংগঠনের পরিচালক কবি মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, সংস্কৃতি ও সংগীতের রাজধানী খ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দ্য আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে বারবার হামলার ঘটনায় মন ভেঙেছে আমাদের। প্রতিবার কেন প্রতিষ্ঠানটিতে বর্বর হামলার ঘটনা ঘটে। আমরা এ ঘটনার বিচার কার কাছে চাইব। অতীতে বিচার পাইনি, হয়তো এবারও পাব না।
প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা প্রহরী সাজন সরকার বলেন, প্রতিষ্ঠানটি তিনটি গেইট তালা দিয়ে আমি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারা শাবল ও হ্যামার দিয়ে তালা ভেঙে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমি প্রতিষ্ঠানটির একটি কক্ষে থাকি। বর্তমানে ঘরগুলো ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির আর কিছু রক্ষিত নেই। রাত পর্যন্ত আগুন জ্বলেছে। হরতাল পালনকারীদের ভয়ে কেউ আগুন নেভাতে এগিয়ে আসেনি।
আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের পুড়ে যাওয়া দৃশ্য দেখে কাঁদতে থাকেন প্রবীণ সংগীত প্রশিক্ষক ছবি ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন ,পবিত্র এই প্রতিষ্ঠানটির এমন করুন অবস্থা দেখে বুক ফেটে কান্না আসছে। সংগীতের ওপর এত রাগ কীসের?
ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র সাইদুল ইসলাম রেজবী বলেন, আলাউদ্দিন খাঁ তো মোদীর আত্মীয় নন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি পুড়িয়ে অধর্মের কাজই করলেন তারা।
প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক নাট্যব্যক্তিত্ব মনজুরুল আলম বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে থাকা অতি দুর্লভ আড়াই শ বই, আড়াই হাজার ছবি, দলিলপত্র, আলাউদ্দিন খাঁর লেখা সংগীতের পাণ্ডুলিপি, দুর্লভ ছবি, সংগীতের যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি হারমোনিয়াম,১৯ জোড়া তবলা, সেতার, তবলা, বেহালা, খঞ্জন, রবাব ও বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্র সরোদ ছিল। সব মিলিয়ে অন্তত ৩৫ লাখ টাকার যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এবারের হামলা ছিল অতীতের যেকোনো হামলার চেয়ে ভয়াবহ। যারা মুক্ত চিন্তা ও শুদ্ধ সংগীত চর্চা পছন্দ করেন না, তারাই এ হামলা চালিয়েছে।
সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নিজের কেনা জায়গায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরাতন জেলরোডে ১৯৫৬ সালে ৫৬ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সুর সম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন’ প্রতিষ্ঠানটি। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি পরিচালনা কমিটি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতে ইসলামের হরতালের দিন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদ এনডিসি।
সোমবার বিকেলে সরেজমিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুড়িয়ে দেওয়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করার জন্য বলা হয়েছে।এরপর সরকারি সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরো বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ বড়ুয়া।
একইদিন সকাল থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শন করেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন।
আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া সব প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় তিনি জানান, হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের প্রতিটি ঘটনার মামলা হবে। ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি তাণ্ডবের মামলাগুলোও দেখা হবে।
তিনি আরো বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে প্রচুর ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। আলামত সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ টিম হিসাবে সিআইডি ও পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম জানান, ২৬ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত হেফাজত নেতাকর্মীরা আন্দোলনের নামে অর্ধশত স্থাপনা ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দিয়েছেন। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় নাম পরিচয়হীন পাঁচ হাজারেরও অধিকজনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৪ জনকে। এ ছাড়া প্রতিটি ঘটনায় একাধিক মামলার প্রস্তুতি চলছে।
২৮ মার্চ হেফাজতের হরতাল চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে পৌরভবন, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গন, আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষা চত্বর, সরকারের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উন্নয়ন মেলা, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মামুন সরকারের মুন্সেফ পাড়ার বাড়ি, ভাষা চত্বরের অফিস, বাগানবাড়ির শ্বশুর বাড়ি, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রবিউল হোসেন রুবেল ও সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন শোভনের বাড়ি, ছাত্রলীগ নেতা জেনির মার্কেট, সরাইল বিশ্বরোড মোড়ে পুলিশ ফাঁড়ি, সদর উপজেলা ভূমি অফিসে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি, জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়, পুলিশ লাইন, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান মন্দির কালিবাড়ি, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, জেলা শিশু একাডেমির কয়েকটি কক্ষ, সুহিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ, আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ যুগ্ম-আহ্বায়ক আবু নাসেরের বাড়ি ভাঙচুর করে তাণ্ডব চালানো হয়।
হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীসহ সমর্থকরা এ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এর আগে ২৬ মার্চ হেফাজত সমর্থক মাদ্রাসা ছাত্ররা ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন পুড়িয়ে দেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা সিভিল সার্জন অফিস, সার্কিট হাউস, বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় তারা।
এ সময় প্রতিটি স্থানেই বঙ্গবন্ধুর ছবি-ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়।
