আগামীকাল সোমবার থেকে দেশে এক সপ্তাহের জন্য ‘লকডাউন’ শুরু হবেদুজন মন্ত্রী এ খবর জানানোর পর রাজধানীর বাজারগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। পণ্য কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে অনেক বাজারে বিশৃঙ্খলা, হাতাহাতির খবরও পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে দূরপাল্লার বাস টার্মিনাল, স্টেশন ও লঞ্চঘাটে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমান।
গতকাল শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের চাপে বিক্রেতারা হিমশিম খাচ্ছেন। প্রত্যেকে অতিরিক্ত পণ্য কিনছেন। কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় হাতাহাতিরও খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সদরঘাটে দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চে যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড় দেখা গেছে। এছাড়া গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল এবং কমলাপুর রেল স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সকালে প্রথম ‘লকডাউনের’ খবর জানান। এরপর জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দুপুরে ‘লকডাউনের’ সিদ্ধান্তের কথা জানান। লকডাউনের আওতায় সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে পণ্যবাহী যানবাহন, অ্যাম্বুলেন্স ও গণমাধ্যমকর্মীদের চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। দুপুরের পর রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘সাত দিনের লকডাউনের সময় যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ থাকবে, তবে মালবাহী ট্রেন স্বাভাবিক থাকবে। যেসব যাত্রী অগ্রিম টিকেট করেছেন তাদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে।’
একইভাবে সোমবার সকাল থেকে বাস, লঞ্চ, যাত্রীবাহী বিমান চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে স্ব স্ব কর্র্তৃপক্ষ। এমন খবরে দুপুরের পর ঢাকার সব গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন কেন্দ্রে রাজধানী ছেড়ে যাওয়া মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। আসন না থাকায় ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠার খবর পাওয়া গেছে। গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সাধারণ মানুষের ধারণা, সরকার সাত দিনের ‘লকডাউন’ ঘোষণা করলেও সেটি দীর্ঘায়িত হতে পারে। ফলে ভোগান্তি এড়াতে কাজ ফেলে গ্রামে চলে যাচ্ছেন তারা।
‘লকডাউনে’র খবরে দুপুরের পর রাজধানীর অন্যতম বড় তিন বাজার মোহাম্মদপুরের টাউন হল, হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজারে ক্রেতাদের বাড়তি ভিড় দেখা যায়। বেশিরভাগ মানুষ সংসারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যচাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ ও আলু কিনছিলেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে বেলা সোয়া ২টার দিকে মোহাম্মদপুরের টাউন হল কাঁচাবাজারের দুই পাশে শের শাহ সূরী সড়ক ও শাহজাহান সড়কে সারি সারি দাঁড়ানো ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার)। ব্যবসায়ীরা জানান, ভরদুপুরে সাধারণত এমন ভিড় থাকে না। লকডাউনের খবর শুনেই ক্রেতারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বাজারে আসছেন। তবে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের কেউ কেউ বলছেন, একদিকে মাসের প্রথম শনিবার, অন্যদিকে সামনের সপ্তাহ থেকে রোজা। অনেকেই মাসের ও রোজার বাজার একসঙ্গে করছেন। তাই ক্রেতা কিছুটা বেশি।
জাভেদ হোসেন নামে এক ক্রেতার হাতে লম্বা ফর্দ দেখা গেল। তার গাড়ির চালকের হাতে বড় দুটি বাজারের ব্যাগ। তিনি বলেন, ‘রোজার বাজার গতকাল শুক্রবার করেছি। লকডাউনের খবর শোনার পর আবার বাড়তি কিছু কিনে রাখার জন্য বাজারে এসেছি।’ শ্যামলীর বাসিন্দা মাসুদুল করিম জানান, তিনি বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় বাসা থেকে ‘লকডাউন’ দেওয়ার খবর জানিয়ে ডাল, পেঁয়াজ, আলু ও সবজি নিয়ে যেতে বলা হয়। তিনি বলেন, ‘লকডাউন’ কত দিন থাকে, বলা তো যায় না। তা ছাড়া এই সময়ে বাজারে যত কম আসতে হয় ততই ভালো। তাই যতটুকু সম্ভব বাজার করলাম।
কারওয়ান বাজারের সরকারি অফিসগুলোতে শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। তারপরও ভিড় অন্যান্য ছুটির দিনের তুলনায় বেশি দেখা গেছে। প্রাইভেট কার থামিয়ে অনেকেই কেনাকাটা করছিলেন। তাদের একজন মোহাম্মদপুরের জামাল হোসেন। তিনি বলেন, সংক্রমণ বৃদ্ধির এই পরিস্থিতিতে বারবার যাতে বাজারে না আসতে হয়, তাই বাড়তি পরিমাণে কিনেছি।
হাতিরপুল কাঁচাবাজারে মুদিদোকানের সামনে মানুষের ভিড় দেখা যায়। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দিতে ব্যস্ত ছিলেন দোকানিরাও।
দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে গত বছরের ৮ মার্চ। এরপর ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। তখন সাধারণ ছুটির আগে বাজারে ব্যাপক ভিড় হয়েছিল। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেশ বেড়ে যায়। এ বছর চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগে থেকেই চড়া। তবে হাতিরপুল বাজারের ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বলেন, চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ ইত্যাদির সরবরাহে ঘাটতি নেই। তিনি মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন।
