পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস রমজান সমাগত। রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানের হক আদায়ের জন্য প্রাক-প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। নিজে প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে রমজানের গুরুত্ব, ফজিলত ও পবিত্রতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখাও জরুরি। কারণ রমজান অনেক ফজিলতময় ইবাদতের মাস। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের রমজানের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নানাভাবে উৎসাহিত-উদ্দীপিত করতেন, সর্বস্ব নিয়োগ করে তাতে কল্যাণ আহরণের জন্য আত্মনিয়োগের পরামর্শ দিতেন। রোজা ও রমজানের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলোর অধিকাংশই রমজানের আগের বিভিন্ন বৈঠকে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জানিয়েছেন। তিনি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘রমজান- বরকতময় মাস। তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। পুরো মাস রোজা পালন আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরজ করেছেন। এ মাসে আল্লাহ কর্র্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে বঞ্চিত হলো (মহাকল্যাণ থেকে)।’ (সুনানে নাসায়ি : ২১০৬)
রমজান আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জনের মাস। তাই রমজানে সব ধরনের গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতে হবে। অনেক মানুষ না জেনে কিংবা না বুঝে রমজানে ইবাদত-বন্দেগি ছেড়ে আল্লাহকে ভুলে দুনিয়ার দিকে ধাবিত হয়, আবার কেউ রমজানকে কেন্দ্র করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী গুদামজাত করে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। অনেকে রমজান সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন থাকে। এর কোনোটাই কাম্য নয়। এই শ্রেণির লোকদের বিষয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জনগণের জীবিকা সংকীর্ণ করে যে ব্যক্তি খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করবে সে বড় অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। আর জেনে রাখো! সে গুনাহগার হিসেবে সাব্যস্ত হবে।’ (সহিহ মুসলিম ও তিরমিজি)
হাদিসে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখবে, মানুষকে কষ্ট দেবে, সে এ সম্পদ দান করে দিলেও তার গুনাহ মাফের জন্য যথেষ্ট হবে না।’ (মিশকাত)
পবিত্র রমজান মহাসম্মান ও মর্যাদার মাস। এ মাসকে আল্লাহতায়ালা বেছে নিয়েছেন মহাগ্রন্থ কোরআন নাজিলের মাস হিসেবে। কোরআন নাজিলের কারণে এ মাসের মর্যাদা বেড়ে গেছে। কোরআনকে আল্লাহতায়ালা মানুষের জীবনব্যবস্থার জন্য রমজান মাসে প্রেরণ করেছেন। তাই এ মাসে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে। কোরআন বুঝতে হবে, কোরআন মতে জীবন পরিচালনা করতে হবে।
অনর্থক কাজকর্ম, অসার বাক্যালাপ পরিহার করে অন্তরকে যাবতীয় পাপ-পঙ্কিলতা থেকে বিরত রেখে শুধু ইবাদতে মশগুল থাকার মাস রমজান। ফজিলতে ভরপুর এই মাসে মুমিন-মুসলমানরা রোজা পালন করে মুত্তাকি হওয়ার অপূর্ব সুযোগ লাভ করেন। এ সুযোগ মানুষের জন্য আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহতায়ালা বলেন, বনি আদমের সমস্ত আমল তার জন্য, তবে রোজা তা কেবল আমারই জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব।’ (সহিহ মুসলিম)
রোজা হলো মুত্তাকি হওয়ার অন্যতম উপায়। সুরা বাকারায় আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ মুমিন হিসেবে নিজেকে মুত্তাকির কাতারে নাম লেখাতে আমাদের রমজান যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
রমজানের প্রস্তুতির অন্যতম হলো মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া, রমজানের আয়-ব্যয়ের হিসাব করে হালাল বস্তুর সাহরি ও ইফতারের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, কাজের বোঝা হালকা করে ইবাদতমুখী হওয়া, কথা ও কাজে কাউকে কষ্ট না দেওয়া, অধীনস্থদের কাজের বোঝা কমিয়ে দেওয়া, মিথ্যা, প্রতারণা, মানুষকে কষ্ট দেওয়ার মতো হারাম কাজ বর্জন করা, দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করার মতো অপরাধ না করা, রমজানের বিধি-বিধান সম্পর্কে জানা ও রমজানবিষয়ক বইপত্র অধ্যয়ন করা ইত্যাদি।
রমজানের প্রস্তুতির আরেকটি দিক হলো, রমজানের আগমন সংবাদে আনন্দ প্রকাশ করা। হজরত রাসুলে কারিম (সা.) রমজানের আগমনে অতিশয় আনন্দিত হতেন এবং বিভিন্ন সময়ে রহমত-বরকত ও কল্যাণ বর্ষণ এবং অবতরণের উপলক্ষ ও অনুষঙ্গগুলোর কারণে ব্যাকুল হতেন। সাহাবিদের বলতেন, তোমাদের দ্বারে বরকতময় মাস রমজান এসেছে। (সুনানে নাসায়ি : ২১০৬)
আগত রমজানে বৈশ্বিক মহামারী করোনা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহতায়ালার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার পাশাপাশি এ মাসের পূর্ণ বরকত লাভের জন্য নিজেকে সব ধরনের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত রেখে একনিষ্ঠভাবে ইবাদত-বন্দেগির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতির পাশাপাশি, আল্লাহর কাছে রমজানের রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও নাজাত প্রার্থনা করতে হবে। রমজানকে সম্মানের সঙ্গে স্বাগত জানাতে হবে। রমজানের রোজা পালন করে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সংযমী হওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তবেই সার্থক হবে আমাদের রমজান পালন।
