সাবেক আইনমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। গত বুধবার ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ৭১ বছর বয়সী এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। এদিকে আব্দুল মতিন খসরুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রীসহ বিশিষ্টজনেরা।
গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। এর মধ্যে একাধিকবার তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। আক্রান্তের ১৭ দিন পর করোনাভাইরাসের রিপোর্ট নেগেটিভ এলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত মঙ্গলবার তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেখানেই বুধবার মারা যান তিনি।
করোনায় আক্রান্ত হওয়ার দুদিন আগে গত ১৩ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট বারের (২০২১-২২) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ (সাদা প্যানেল) থেকে সভাপতি প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন তিনি। তিনি প্রথমবার এই পদে জিতলেও আইনজীবীদের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হলো না তার।
১৯৫০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার মিরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সে সময় কুমিল্লা জেলার অবিভক্ত বুড়িচং থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন আব্দুল মতিন খসরু। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ১৯৭৮ সালে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৮২ সাল থেকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশায় যুক্ত হন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিচারে বাধা ছিল কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। আইনমন্ত্রী থাকালে আব্দুল মতিন খসরু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে জাতির পিতা হত্যার বিচারের পথ খোলে এবং খুনিদের ফাঁসির রায় এবং বেশ কয়েকজনের সাজা কার্যকর হয়। তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে উঠে আসা অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষ তিনি দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তাকে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়।
আব্দুল মতিন খসরুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি তার শোকবাণীতে বলেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তার অবদান দেশের সংসদীয় ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করার মাধ্যমে জাতির পিতার হত্যা মামলা বিচারে তার ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’
পৃথক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘একজন বিজ্ঞ আইনজীবী ও জনমানুষের নেতা হিসেবে মতিন খসরু চিরদিন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার উত্তরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একজন জননেতা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিককে হারালাম যিনি জাতির পিতার হত্যাকা-ের বিচারসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মামলায় আইনজ্ঞ হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন।’
আব্দুল মতিন খসরুর সঙ্গে ৪০ বছরের সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন শোকবাণীতে বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত নির্লোভ, নিরহংকারী এবং সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তার অসামান্য অবদান রয়েছে। আইন অঙ্গনের সবাই তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবেন।’
সুপ্রিম কোর্টে শেষ বিদায়
রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রথম জানাজা শেষে আব্দুল মতিন খসরুর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার প্রিয় প্রাঙ্গণ সুপ্রিম কোর্টে। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. আশরাফ আলী খান খসরু, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরাসহ অসংখ্য আইনজীবী জানাজায় অংশ নেন। জানাজার আগে আবদুল মতিন খসরুর ছেলে আবদুল মুনায়েম ওয়াসিফ বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চান। এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন খসরুকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
এ সময় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের পক্ষে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এরপর প্রধান বিচারপতি অপর বিচারপতিদের নিয়ে কফিনে শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষে মাহবুব উল আলম হানিফ, আইনমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল, ডিএসসিসি মেয়র, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, কৃষকলীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের আইন উপ-কমিটি, আবদুল মতিন খসরু অ্যাসোসিয়েটস, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ ও ঢাকা আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষে আব্দুল মতিন খসরুর কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
আবদুল মতিন খসরুর চেম্বারের জুনিয়র (সহকারী আইনজীবী) মো. সারোয়ার আলম বলেন, সুপ্রিম কোর্টে জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আব্দুল মতিন খসরুর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লায়। সেখানে তার নির্বাচনী এলাকা বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ায় জানাজা হয়। পরে ব্রাহ্মনপাড়ার মিরপুরে গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে বাদ আসর আব্দুল মতিন খসরুকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মতিন খসরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হয়নি বিচার কার্যক্রম
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আব্দুল মতিন খসরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের ভার্চুয়ালি বিচার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আজ (গতকাল) সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আপিল বিভাগের ১ নম্বর আদালতে এ বিষয়টি সবাইকে অবহিত করেন।
