আজ অনুষ্ঠিত হবে ৭ম তারাবি। আজকের খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ১০ম পারা পূর্ণ তেলাওয়াত করা হবে। সুরা আনফালের ৪১ আয়াত থেকে তেলাওয়াত শুরু করে সুরা তওবার ৯৩ আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে। সুরা আনফালের ৪১-৭৫ আয়াতে জিহাদ, বদর যুদ্ধের ঘটনা ও শিক্ষা, যুদ্ধবন্দি ও গনিমতসহ যুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন আলোচনা স্থান পেয়েছে।
সুরা তওবার আরেক নাম বারাআত। মদিনায় অবতীর্ণ হওয়া এ সুরার মোট আয়াত ১২৯টি। আজ তেলাওয়াত করা হবে শুরু থেকে ৯৩ আয়াত পর্যন্ত। তওবা অর্থ ক্ষমা। এই সুরায় মুসলমানদের তওবা কবুল হওয়ার বর্ণনা রয়েছে। এই সুরার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখা হয় না ও পাঠ করা হয় না। সুরা তওবায় যুদ্ধ (মক্কা বিজয়, হোনাইন যুদ্ধ, তাবুক যুদ্ধ), যুদ্ধ সংক্রান্ত ঘটনা এবং এ সংক্রান্ত হুকুম, মাসায়েল ইত্যাদি বর্ণনা রয়েছে।
সুরাটি মূলত তিনটি ভাষণের সমষ্টি। প্রথম ভাষণটি সুরার প্রথম থেকে শুরু হয়ে পঞ্চম রুকুর শেষ অবধি। নাজিলের সময় ৯ হিজরির জিলকদ মাস বা তার কাছাকাছি সময়। নবী (সা.) সে বছর হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কে আমিরুল হজ নিযুক্ত করে মক্কায় রওনা করে দিয়েছিলেন। এমন সময় এ ভাষণটি নাজিল হয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে হজরত আলী (রা.) কে তার পেছনে পাঠিয়ে দেন। যাতে হজের সময় গোটা আরবের প্রতিনিধিত্বশীল সমাবেশে অবতরণকৃত কোরআনের বিষয়াবলি পাঠ করে শোনানো হয় এবং সে অনুযায়ী কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।
দ্বিতীয় ভাষণটি ৬ রুকুর শুরু থেকে ৯ রুকুর শেষ পর্যন্ত। এ অংশটুকু ৯ হিজরির রজব মাসে বা তার কিছু আগে নাজিল হয়। সে সময় নবী করিম (সা.) তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এখানে মুমিনদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। যারা মুনাফেকি, দুর্বল ইমান ও অলসতার কারণে আল্লাহর পথে ধনপ্রাণের ক্ষতি বরদাশত করার ব্যাপারে টালবাহানা করছিল তাদের কঠোর ভাষায় তিরস্কার করা হয়েছে।
জিহাদ ইসলামের একটি নিজস্ব পরিভাষা। যখন কোনো রাষ্ট্র শক্তি তার মুসলিম নাগরিকদের নিগৃহীত করবে, জাতিগতভাবে নিধনে মেতে উঠবে, তাদের মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো স্থগিত করবে তখন সেই সব নির্যাতিত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পরিত্রাণ দেওয়ার জন্য যদি মুসলিম রাষ্ট্র প্রচেষ্টা চালায়, কূটনৈতিক সব তৎপরতা চালিয়ে নির্যাতনকারী রাষ্ট্রকে থামাতে ব্যর্থ হয় তখন মানবতাকে মুক্ত করার জন্য, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ করার জন্য, মুসলিমদের হেফাজত করার জন্য সেই উদ্যোগী মুসলিম রাষ্ট্র নির্যাতনকারী রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা দেবে। যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা, ঘোষণা ও পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া শান্তিবিরাজমান নিরাপদ ভূখণ্ডের অধিবাসীদের ওপর কেউ যদি ইসলামের নামে সশস্ত্র আক্রমণ করে তাহলে এ দায় একান্তভাবে তার নিজের। এ দায় ইসলামের নয়। সন্ত্রাস অপরাধ অবশ্যই। আবার সন্ত্রাসের সঙ্গে জিহাদকে এক করে দেখা, জিহাদকে অস্বীকার করা পাপ। ইসলাম এভাবে সব ধরনের প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবতীয় বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকার আদেশ দেয়। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য্য।
তৃতীয় ভাষণটি ১০ রুকু থেকে শুরু হয়ে সুরার শেষ পর্যন্ত। তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর এ অংশটি নাজিল হয়। এখানে এমন অনেকগুলো খণ্ডিত বিষয় রয়েছে যেগুলো ওই দিনগুলোতে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও পরিবেশের কারণে নাজিল হয়; পরে নবী করিম (সা.) আল্লাহর হুকুমে সেগুলো সব একত্র করে একই ধারাবাহিক ভাষণের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেন। কিন্তু যেহেতু সেগুলো একই বিষয়বস্তু ও একই ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাই ভাষণের ধারাবাহিকতা কোথাও ব্যাহত হতে দেখা যায় না। এখানে মুনাফিকদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। তাবুক যুদ্ধে যারা পেছনে রয়ে গিয়েছিলেন তাদের ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করা হয়েছে। আর যে সাচ্চা ইমানদার, নিজেদের ইমানের ব্যাপারে নিষ্ঠাবান ছিলেন; কিন্তু আল্লাহর পথে জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিলেন তিরস্কার করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ক্ষমার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
এ সুরার বিষয়বস্তুর সঙ্গে যে ঘটনা পরম্পরার সম্পর্ক রয়েছে, তার সূত্রপাত ঘটেছে মূলত হোদাইবিয়ার সন্ধি থেকে। হোদাবিয়া পর্যন্ত ছ’বছরের অবিশ্রান্ত প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের ফলে আরবের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ এলাকায় ইসলাম একটি সুসংগঠিত ও সংঘবদ্ধ সমাজের ধর্ম, একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়। হোদায়বিয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইসলাম আরও বেশি নিরাপদ পরিবেশে চারদিকে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পায়।
সুরা তওবার ১৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহর মসজিদসমূহের যথার্থ খেদমত তারাই করতে পারে, যারা আল্লাহ ও পরকালের ওপর ইমান রাখে। গুরুত্বের সঙ্গে সুন্দরভাবে নামাজ আদায় করে, জাকাত প্রদান করে ও আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না।
৬০ নম্বর আয়াতে জাকাতসহ সব ওয়াজিব দানের খাত উল্লেখ করা হয়েছে। ওই খাতগুলো হলো নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, ইসলামি রাষ্ট্রের জাকাত বিভাগের কর্মচারী, দুর্বল নও মুসলিম, দাসমুক্ত করা, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর দ্বীনের জন্য জিহাদকারী ও অভিবাসী।
