রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার সাত হাজার টাকা ও মোবাইল চুরিসহ মারধরের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হককে ৭ দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম তাকে ৭ দিনের পুলিশি রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই মো. সাজেদুল হক আসামিকে আদালতে হাজির করে ৭ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। রবিবার দুপুরে হেফাজতের আলোচিত এই নেতাকে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গত রবিবার মামুনুলকে গ্রেপ্তারের পর প্রথমে তাকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও উপকমিশনার কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় তেজগাঁও থানায়। তেজগাঁও থানা থেকে রাতে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ডিবি কার্যালয়ে তাকে কথিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ডিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, আমরা মামুনুল হককে বিভিন্ন বিষয়ে জেরা করি। তার কাছে জানতে চাই জান্নাত আরা ঝর্ণার ছেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়ে তার বক্তব্য কী। মামুনুল বলেন, ঝর্ণা তার স্ত্রী। শরিয়ত সম্মতভাবে তিনি তাকে বিয়ে করেছেন। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর থানায় জনৈক শাহজাহানের করা সাধারণ ডায়েরির বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়। এ বিষয়ে মামুনুল বলেন, শাহজাহান জিডিতে জান্নাত নামে যে নারীর কথা বলেছেন, তিনিও মামুনুলের বিবাহিত স্ত্রী। গতকাল সকালে মোহাম্মদপুর থানার এসআই মো. সাজেদুল হক মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে মামুনুলকে জেরা করেন। তিনি মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিং এলাকার বাসিন্দা জিএম আলমগীর শাহীনের মামলার বিষয়ে জানতে জান। আলমগীর শাহীন ২০২০ সালের ৭ মার্চ মোহাম্মদপুর থানায় মামুনুলসহ ৮ আসামির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।
শাহীন তার মামলায় উল্লেখ করেন, ‘২০২০ সালের ৬ মার্চ সাত মসজিদে আমল (এবাদত) করার জন্য গেলে মাদ্রাসার ছাত্র ওমর, ওসমান, ওজায়ের তাকে মজিদে আমল করতে যেতে নিষেধ করেন এবং মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। মসজিদ থেকে বের না হলে আসামি ওমর, ওসমান, শহীদ, মাওলানা আনিস মসজিদের মধ্যে এসে আসাদ, মোর্শেদ, আলী, ইয়াকুবসহ অনেককে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারে।’ বাদী আরও উল্লেখ করেন, আসামিরা বাদীকে মারধর করে গুরুতর জখম করে। এতে তিনি মসজিদে শুয়ে পড়েন। এ সময় আসামিরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যায়। এসব কর্মকা- মাদ্রাসার মোহতামিম মাহফুজুল হক ও তার ভাই মামুনুল হকের নির্দেশে সংঘটিত হয়েছে। বিবাদীরা যাওয়ার সময় বাদীর একটি সামস্যাং এ-৫০ মডেলের মোবাইল ফোন, ৭ হাজার টাকাসহ মানিব্যাগ, ২০০ ডলার, ব্র্যাক ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড নিয়ে যায়।’
এ মামলায় মামুনুলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল মোহাম্মদপুর থানার এসআই সাজেদুল হক তার ৭ দিন রিমান্ড আবেদনসহ আদালতে প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, মামলার ৭ নম্বর আসামি মামুনুল হক হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক। মামুনুল হক ও তার ভাই মাহফুজুল হকের নির্দেশে ২০২০ সালের ৬ মার্চ মামলার বাদীকে অপর আসামিসহ মসজিদে আমল করতে নিষেধ করেন। মামুনুল ও তার ভাইয়ের নির্দেশে বাদীকে মারধর করা, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ টাকাপয়সা ছিনিয়ে নেয়। আসামিরা বাদীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ মসজিদে আমল করতে নিষেধ করে। আসামির বিরুদ্ধে অত্র মামলায় জড়িত থাকা সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত অপর আসামিদের শনাক্ত করা ও লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের জন্য পুলিশ ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন জানায়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পর প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লহ আবু আসামিকে ৭ দিন রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করেন। পরে আসামির পক্ষে জয়নুল আবেদীন মেজবাহ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। পরে বিচারক মামুনুল হকের কাছে জানতে চান তার কিছু বলার আছে কি না। তখন মামুনুল হক আদালতে বলেন, ‘স্যার, আমাকে গ্রেপ্তার করে গতকাল যেখানে রাখা হয়েছিল, সেটি থাকার মতো জায়গা না। ওই রকম জায়গায় ইবাদত করা যায় না। অন্যান্য রমজানে আমি নিয়মিত কোরআন খতম করি। রিমান্ডে পাঠালে সুষ্ঠু পরিবেশ থাববে না এবং আমার ইবাদত করা কঠিন হয়ে যাবে। গ্রেপ্তারের পর আমাকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমাকে রিমান্ড দিয়েন না। এ মামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। শুনানি শেষে মামুনুলের ইবাদতে যেন বিঘœ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য বিচারক রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে মামুনুলের বিরুদ্ধে লালবাগ, কুমিল্লার চান্দিনা, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, পেনালকোডসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
দুই বিয়ের কাবিন নেই : মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, মামুনুলকে গতকাল থেকেই মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে তাকে হেফাজতের বিভিন্ন কর্মকা-, রাষ্ট্র এবং সরকারের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হেফাজতের এসব আন্দোলনের অর্থ কোথা থেকে আসে, এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। মামুনুল কৌশলে অনেক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান।
রবিবার গ্রেপ্তারের পর তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদ তার কার্যালয়ে মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে হারুন অর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল তিনটি বিয়ের কথা স্বীকার করেছেন। এর মধ্যে প্রথম বিয়ের কাবিন (নিকাহ রেজিস্ট্র্রি) হয়েছে। অপর দুটির কাবিন করেননি।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল জানান, সোনারগাঁ রিসোর্টে যে নারীসহ মামুনুল অবরুদ্ধ হয়েছিলেন, তার নাম জান্নাত আর ঝর্ণা। তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী। তার তৃতীয় স্ত্রীও আছে। তার নাম জান্নাতুল ফেরদৌস লিপি। তিনি কেরানীগঞ্জে একটি মাদ্রাসার শিক্ষক। লিপি তার ছোট স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী আমেনা তৈয়বা। এই ঘরে তার চার সন্তান আছে। পরের দুটি বিয়ে তিনি শরিয়তসম্মতভাবে করেছেন। তবে কাবিননামা করেননি।
মামুনলের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ‘মুসলিম পারিবারিক আইনে বিয়ের রেজিস্ট্রি (নিবন্ধন) একটি প্রামাণ্য দলিল। নিবন্ধন ছাড়া বিয়ে প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। নিবন্ধন না থাকলে নারীরা প্রতারিত হতে পারেন। তাই বিয়ের নিবন্ধন আবশ্যক। দেনমোহর, ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার নির্ণয়, সন্তানের পিতৃত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিবন্ধনকৃত কাবিননামা একটি আইনগত দলিল। বিয়ে নিবন্ধন না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে মামুনুল যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘ইসলামি শরিয়তে বিয়ের শর্তে নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা নেই। সেখানে দেনমোহর, সাক্ষী, প্রস্তাব (ইজাব), গ্রহণ (কবুল) বাধ্যতামূলক। তিনি তাই করেছেন।’ এ সময় ডিবির কর্মকর্তারা মামুনুলের দুই বিয়েতে কারা কারা সাক্ষী ছিলেন, তাদের নাম-পরিচয় জানতে চান।
দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিয়ের নিবন্ধন না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিবন্ধন না করলে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদ- ও ৩ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ড হতে পারে। তবে বিয়ে বাতিল হবে না।’
৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে রয়েল রিসোর্টে এক নারীসহ অবরুদ্ধ হন মামুনুলÑ খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা সেখানে যান। পরে হেফাজতের কর্মীরা গিয়ে তাণ্ডব চালিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। মামুনুলের দাবি, ওই নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে সেটা নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। এ ছাড়া জান্নাত নামে কেরানীগঞ্জের একজন মাদ্রাসা শিক্ষিকার সঙ্গে মামুনুলের কয়েকটি ফোন রেকর্ড ফাঁস হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় পড়েন মামুনুল।
তা ছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশের সফরের প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করে হেফাজত। এ সময় তাদের বিক্ষোভ ও ঢাকা হরতালে সারা দেশে ১৭ জন নিহত হন। এসব আন্দোলনে উসকানির অভিযোগ রয়েছে মামুনলের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার জেরে হেফাজতের পুরনো মামলাগুলো সচল করে পুলিশ সারা দেশে নতুন কিছু মামলা দেওয়া হয়। এসব মামলায় ১১ এপ্রিল থেকে হেফাজতের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরীর মোট ৯ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপর নেতারা হলেন মামুনুল হক, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা যুবায়ের আহমেদ, মাওলানা জালাল উদ্দিন, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা ইলিয়াস হামিদী ও মুফতি শরীফুল্লাহ।
