তুরস্কের রমজান উৎসব

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১২:২৬ এএম

ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি ধর্মীয় সংস্কৃতি পালন এবং ঐতিহ্য রক্ষায় তুরস্কের মানুষের প্রচেষ্টা বরাবরই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উসমানীয় শাসন অবসানের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে সেক্যুলারিজমের নীতি গ্রহণ করা হলেও বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় কার্যক্রম ও উৎসব পালনের ক্ষেত্রে শতবছর আগের ঐতিহ্যকে এখনো ধরে রেখেছেন তারা।

উসমানীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তুরস্কের মুসলমানরা এখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে, তোপধ্বনি দিয়ে এক ভিন্ন আমেজে পবিত্র রমজান মাসকে বরণ করে। রমজানকে স্বাগত জানাতে ব্যানার-ফেস্টুনে বিভিন্ন অভিবাদনমূলক বাক্য লিখে রাস্তার মোড়ে মোড়ে টাঙানো হয়। পুরো রমজানে তুরস্কজুড়ে বিরাজ করে রোজা পালনের এক উৎসব।

ইবাদতের মাস রমজান। এই মাসে তাদের মধ্যে ইবাদতের এক বিশেষ আমেজ বিরাজ করে। এটি লক্ষণীয় বিষয়। অন্য মাসের তুলনায় রমজানে তারা ইবাদত-বন্দেগি ও বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করেন খুব আগ্রহ ও বিনয়ের সঙ্গে। রমজান উপলক্ষে তুরস্কের মসজিদগুলোকে সুসজ্জিত করা হয়, মানুষের বিপুল উপস্থিতির কারণে এ মাসে মসজিদগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ ও তারাবির নামাজে থাকে ছোট-বড় সবার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। প্রতিটি বাড়ি ও মসজিদ মুখরিত থাকে পবিত্র কোরাআন তেলাওয়াতের সুরে। তুরস্কের মানুষ রমজান মাসে কোরআন খতম করতে খুব তৎপর থাকেন। এটা নিয়ে নানা স্থানে প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়।

তুরস্কের মুসলমানরা সাহরি ও ইফতারির আয়োজন করেন গণজমায়েত করে রাজকীয়ভাবে। এতে থাকে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমাহার। ইফতারিতে হালকা খাবার হিসেবে জুস, খেজুর, পাইড বিশেষ ধরনের ঐতিহ্যবাহী রুটি, হালুয়া ও জলপাই তেলের ব্যবস্থা থাকে। ইফতারের পর চা-কফি পানের রীতি তুর্কিদের বেশ পুরনো অভ্যাস। এছাড়া তুর্কিরা সাহরির সময় ভারী খাবার খেয়ে থাকেন।

তুরস্কে রমজান মাসে পাইড নামক বিশেষ ধরনের রুটি উসমানীয় ঐতিহ্যের অংশ। ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্য তুরস্কের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ডেইলি সাবাহর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে এক তুর্কি বেকারি মালিক তিন বছর ধরে রমজান মাসজুড়ে প্রতিদিন ৩০০ রুটি বিনামূল্যে বিতরণ করে থাকেন। সিক্কেন ডিকম্যান নামের ওই বেকারির মালিক চলতি বছরও এই কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সাহায্য করা এবং অন্যদের এই কাজে উৎসাহিত করা।’

প্রায় দেড় বছর যাবৎ বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর প্রকোপ চলছে। করোনার সংক্রমণরোধে বিশ^জুড়ে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিভিন্ন উৎসব ও কার্যক্রম পালনে নানা বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। করোনার কারণে গত রমজানের মতো এবারও তুরস্কের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তুরস্কে সাহরি ও ইফতারির সময় গণজমায়েত এবং মসজিদে তারাবির নামাজ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বাসা-বাড়িতে ইবাদত করার ক্ষেত্রেও জমায়েত না হওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। রমজানে শুধুমাত্র খাবার হোটেল ও কফি হাউজগুলো খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে খাবার গ্রহণ ও সরবরাহ পরিষেবার জন্য।

তুরস্কে রমজান মাসের বিশেষ একটি ঐতিহ্য হলো সাহরির সময় রোজাদারদের ঢোলের আওয়াজে জাগ্রত করা। তবে চলতি বছর ব্যাপকভাবে এ প্রথা বন্ধ রয়েছে। তবে সীমিত পরিসরে কিছু ঢাকি ইস্তাম্বুলের রাস্তায় ঢোল বাজিয়ে সাহরির সময় মানুষদের ঘুম থেকে জাগ্রত করার কাজ করছে। তাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দায়িত্বপালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তুরস্কজুড়ে রোজাপালনে ঐতিহ্য চর্চার যে আমেজ ও উৎসব দেখা যেত তা করোনার প্রকোপে গত বছরের মতো এবারও অনেকটাই স্থগিত রাখা হয়েছে। আশা করা যায়, করোনা মহামারীর ইতি ঘটলে আবারও সেই উৎসবমুখর রমজানের দেখা পাবে তুরস্কবাসী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত