বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে বিভিন্ন বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে খতমে তারাবি। খতমে তারাবির ধারাবাহিকতা আজ শেষ হবে। কোরআন খতম আর পবিত্র শবেকদর উপলক্ষে মসজিদে মসজিদে বিশেষ মোনাজাত করা হবে। খতমে তারাবির শেষ দিনে তেলাওয়াত করা হবে কোরআনের ত্রিশতম পারা। এ পারায় ৩৭টি সুরা রয়েছে। আজকের তেলাওয়াতকৃত অংশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ, বিধান, আমল, ইতিহাস ও সতর্কবার্তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সুরা আসর ও সুরা ইখলাস নিয়ে আলোচনা করা হলো।
সুরা আসর পবিত্র কোরআনের ১০৩তম সুরা। আয়াত সংখ্যা ৩। অনেক মুফাসসিরের মতে ছোট হলেও এ সুরায় রয়েছে পবিত্র কোরআনের সমস্ত লক্ষ্য ও জ্ঞানের সংক্ষিপ্তসার। সুরা আসরে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মানুষের সাফল্য ও কল্যাণের এবং তার ধ্বংস ও সর্বনাশের পথ বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এ সুরা প্রসঙ্গে বলেন, ‘লোকরা যদি এই সুরাটি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে তাহলে এই সুরাই তাদের হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট।’
আসর শব্দের অর্থ সময়, কাল বা যুগ কিংবা মানবজাতির ইতিহাস ও যুগের একটি অংশ। অবশ্য অনেকেই মনে করেন, এখানে আসর বলতে পুরো কাল-প্রবাহ ও মানবজাতির ইতিহাসকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের চেতনা আর বিবেকজাগানো বহু শিক্ষণীয় ও লোমহর্ষক ঘটনা এবং উত্থান-পতনের সাক্ষী। আবার অনেক মুফাসসিরের মতে, যুগ বলতে এখানে কেবল নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের যুগকে বোঝানো হয়েছে। যে যুগে ঘটেছিল মানবজাতির কল্যাণের জন্য ইসলামের সূর্যোদয়। যে যুগ হলো মিথ্যার ওপর সত্যের বিজয়ের যুগ।
এ সুরার শুরুতে মহান আল্লাহ শপথ নিয়েছেন সময় তথা কালের। যাতে মানুষ সময়ের মতো মহা নেয়ামতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এর যথাযথ ব্যবহারে সচেতন হয়।
দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলছেন, নিঃসন্দেহে সব মানুষই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। মানুষের আয়ু বরফের মতো ক্রমেই গলছে। স্রোতের মতো দ্রুত বয়ে যাচ্ছে জীবনের মুহূর্ত, ঘণ্টা, দিন-রাত, সপ্তাহ, মাস আর বছরগুলো। যতই দিন যায় মানুষের যৌবনের অমিততেজ ও শক্তি ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। সেই নির্দিষ্ট সময় শেষ হলে নিজ থেকেই থেমে যায় হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন। এমনকি হৃৎপিণ্ড অকেজো হওয়ার জন্য কোনো অসুখেরও দরকার নেই। মানুষের সব শক্তি, ক্ষমতা আর প্রতিভার ব্যাপারটাও একই রকম।
সুরা আসরের তৃতীয় আয়াতে মানুষকে লক্ষ করে কিছু কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে, যা পালন করলে মানুষ ক্ষতিমুক্ত হবে। এ কর্মসূচির প্রথমে ইমানের কথা বলা হয়েছে। ইমান হলো মানুষের সব তৎপরতার ভিত্তি। মানুষের কাজেই প্রকাশ পায় তার বিশ্বাস। কাউকে আল্লাহর অংশীদার ভাবা হচ্ছে সব ধরনের অকল্যাণ, বিভেদ ও অসৎ গুণগুলোর উৎস।
দ্বিতীয় কর্মসূচি সৎকাজ। এটাকে মানুষের মুক্তির নিশ্চয়তা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সৎকাজ বলতে কেবল ইবাদত-বন্দেগি, দান-খয়রাত ও জ্ঞানার্জনকে বোঝায় না। সব ধরনের ভালো কাজই সৎকাজ। যেসব কাজ মানুষের আত্মিক পূর্ণতা, নৈতিক উন্নয়ন ও সমাজের উন্নয়নে সহায়ক তার সবই হলো সৎকাজ।
এরপর আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, ‘এবং পরস্পরকে তাগিদ করে সত্যের এবং তাগিদ করে সবরের।’ অর্থাৎ বিভিন্ন বালা-মসিবত ও দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য, শরিয়তের হুকুম-আহকাম ও ফরজসমূহ পালন করতে ধৈর্য, পাপাচার বর্জন করতে ধৈর্য, কামনা-বাসনা ও কুপ্রবৃত্তি দমনের মতো কাজে ধৈর্যধারণের (বিরত) উপদেশ দেয়। যদিও ধৈর্যধারণের উপদেশ সত্যের উপদেশেরই অন্তর্ভুক্ত, তবু তা বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে ধৈর্যধারণ ও তার উপদেশের মর্যাদা, মাহাত্ম্য এবং সুচরিত্রতায় তার পৃথক বৈশিষ্ট্য থাকার কথা স্পষ্ট হয়।
সুরা ইখলাস কোরআনে কারিমের ১১২ নম্বর সুরা। এই সুরায় মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও সত্তার সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা রয়েছে। এটি কোরআনের অন্যতম ছোট সুরা। তবে এই সুরাকে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান বলা হয়।
ইসলামের মূল ভিত্তি হচ্ছে তাওহিদ তথা আল্লাহর একত্ববাদ। এ সুরায় শেখানো হয়, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তিনি কারও থেকে জন্ম নেননি, কোনো কিছুর সমতুল্য নন তিনি। কোরআন মানুষকে তিনটি মৌলিক জিনিস শেখায় তাওহিদ, আখেরাত (পরকাল) ও রেসালাত (নবুয়ত)। অর্থাৎ আল্লাহ, পরকাল ও অহি। অন্য যেকোনো বিশ্বাস এই তিনটার মধ্যেই নিহিত। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আখেরাতের বিশ্বাস, আল্লাহর প্রেরিত অহির প্রতি বিশ্বাস। যখন আমরা বলি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, এর মধ্যে আল্লাহর সব নাম, সব গুণ, কাজকে বোঝায়। যখন বলি, আখেরাতে বিশ্বাস, তার মধ্যে কবরের জীবন, বিচার দিবস, জান্নাত, জাহান্নামসহ সবকিছু এসে যায়। এভাবে যদি চিন্তা করি, তাহলে বোঝা যায় বিশ্বাসের এক-তৃতীয়াংশই হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের কথাই বর্ণিত হয়েছে সুরা ইখলাসে।
সুরা ইখলাসের ফজিলত অনেক। হাদিসে এসেছে, একবার হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরা সবাই একত্র হও, আমি তোমাদের কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ শোনাব। এরপর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা ইখলাস পাঠ করলেন। (মুসলিম)
এ সুরার নিয়মিত তেলাওয়াত বিপদে-আপদে উপকারী। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-বিকাল সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করে, তাকে বালা-মসিবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হয়। (আবু দাউদ)
