সংসারে অভাবের কারণে বিদ্যালয়ের যাওয়া হয়নি আনসার মিয়ার। ছয় বছর বয়সে বাবার সঙ্গে নড়িয়া উপজেলার একটি ইটের ভাটায় কাজ শুরু করেন।
বাবা-ছেলের আয়েও সংসার চলত না। উন্নতির আশায় আনসারে বয়স যখন আট তখন পরিবারসহ ঢাকার মীরহাজিবাগ চলে আসেন তারা। সেখানে বাবা রঙের কাজ করতেন। আর মা, ভাই-বোনেরা একটি স্টিলের কারখানায় কাজ শুরু করেন। সংসারের সেজ ছেলে আনসার মিয়া। বর্তমানে আনসারের বড় ভাই মানসুর মাদবর (২৫) বিয়ে করে ঢাকাতেই ভিন্ন থাকেন। বাবাও এখন কাজ করতে পারেন না। তাই সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন আনসার মিয়া। সেই অবলম্বনও কেড়ে নিল নির্মম মৃত্যু।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কালিকাপ্রসাদ গ্রামের গিয়াসউদ্দিন মাদবরের (৫০) ছেলে আনসার মিয়া (১৪) মাদারীপুর জেলার শিবচরের বাংলাবাজার ফেরি থেকে নামতে গিয়ে পদপিষ্ঠ হয়ে মারা যান বুধবার।
বুধবার ভোরে ঢাকা মীরহাজিবাগ থেকে বোন নয়ন তারা ও সহকর্মী সবুজকে নিয়ে শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন আনসার। সকাল ৮টার দিকে শিমুলিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে ওঠেন তারা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পদদলিত হয়ে তার মৃত্যু হয়। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন তার সেজ বোন নয়নতারা (১৭)। নয়নতারাও অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পুলিশ ও স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে।
আনসারের মা নাসিমা বেগম (৪০) বলেন, 'আমরা পরিবার নিয়ে ডাকা থাকতাম। লকডাউনের কারণে কাজ কম থাকায় তিন মাস আগে স্বামীকে নিয়ে আমি শরীয়তপুর নিজ বাড়িতে চলে আসি। আমার তিন ছেলে, এক মেয়ে। দুই মেয়ে বিয়ে দিছি। আমার ঘর ছিল না। গ্রামে আসলে কোনো রকম একটা জরাজীর্ণ ঘরে স্বামী ও সন্তান নিয়ে থাকি। তাই গ্রামে এসে ঋণ করে একটি দোচালা টিনের ঘর তুলি। সেই ঋণ পরিশোধ করছিল আনসার। সেই ঘরে আজ আনসারকে নিয়ে
প্রবেশ করব ভাবছিলাম। কিন্তু ফেরি থেকে নামতে গিয়ে যাত্রীর চাপাচাপিতে আনসার মারা গেছে। আমি কাকে বাবা বলে ডাকব?'
আনসারের বাবা গিয়াস উদ্দিন মাদবর বলেন, 'গত রোববার আনসার ফোন দিয়ে বলে বাবা তোমার লুঙ্গী কিনছি। আমি বলি বাবা আমার জন্য লুঙ্গী কিনতে হবে না। তুমি বাড়িতে চলে আস। আহারে আজ দুনিয়া থেকেই চলে গেল ছেলেটা'।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আনসারের সহকর্মী সবুজ বলেন, আমার বাড়ি বরিশাল। আনসারের সঙ্গে কাজ করি। বাড়িতে যাব বলে আনসার, তার বোন নয়নতারা ও আমি শিমুলিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে উঠি। ফেরিতে জায়গা ছিল না। মানুষ আর মানুষ। মানুষের চাপাচাপিতে ফেরি থেকে নামতে গিয়ে আনসার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন ফেরির ফ্লোরে পড়ে যায়। মানুষের পায়ের চাপা পড়ে আনসারের মৃত্যু হয়।
বুধবার বাদআছর নড়িয়া বাংলাবাজার জামে মসজিদে জানাজা শেষে বাংলাবাজার আল আমানত কবরস্থানে আনসার মিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়।
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিরাজ হোসেন জানান, ছেলেটি নামার সময় ভিড়ের চাপে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। উদ্ধার করে ছেলেটির লাশ তার বাড়িতে পাঠিয়েছি।
শরীয়তপুরের নড়িয়া থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অবনী শংকর কর বলেন, বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি। আমি পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ নিচ্ছি।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জয়ন্তী রুপা রায় বলেন, দুর্ঘটনায় নিহতর পরিবারের সঙ্গে কথা বলব। ওই পরিবারকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হবে।
