‘পৃথিবীর সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে আমরা সহিংস আচরণ করছি। আমরা প্রকৃতির হত্যাকারীতে পরিণত হয়েছি।’ কথাগুলো ভারতের ৯৪ বছর বয়সী প্রকৃতিপ্রেমী সুন্দরলাল বহুগুনার। বলা হয়, পরিবেশ রক্ষা করতে ভারতবাসীকে গাছ আলিঙ্গন করা তিনিই শিখিয়েছেন। সত্তরের দশকে উত্তর ভারতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা চিপকো আন্দোলনের মূল নেতা ছিলেন তিনি। হিন্দিতে চিপকোর অর্থ ‘আলিঙ্গন’।
বহুগুনা এবং তার সহ-অ্যাকটিভিস্ট চান্দি প্রসাদ ভাটের আহ্বানে ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলের বহু নারী-পুরুষ গাছ কাটা ঠেকাতে গাছ আলিঙ্গন করেছেন বা সেগুলোর সঙ্গে নিজেদের বেঁধে রেখেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি শক্তিশালী একটি প্রতীকী বার্তা দিয়েছিলেন ‘গাছের আগে আমাদের শরীর’। এই আন্দোলন বিশ^বাসীর মনোযোগ আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। ১৯৭০ সালে উত্তরাখণ্ডের ভয়াবহ বন্যা গ্রামবাসীর কাছে কঠিন হুঁশিয়ারি হয়ে আসে। দীর্ঘদিন চিপকো আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করে আসা ভারতের ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ বলেন, ভূমিধস এবং বন্যার সঙ্গে বনাঞ্চল ধ্বংসের সম্পর্ক নিয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন গ্রামবাসী। এর তিন বছর পর বহুগুনা এবং অনুসারী অ্যাকটিভিস্টরা গাছ আলিঙ্গন শুরু করেন। তরুণেরা প্রকৃতি রক্ষায় রক্ত দেওয়ার শপথ নেয়। খুব শিগগির হিমালয় অঞ্চলের নারীরাও এই আন্দোলনের অভিন্ন অংশ হয়ে ওঠেন। গাছ আলিঙ্গনের পাশাপাশি এতে রাখিও বেঁধে দেন তারা। অনেকে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে কাঠুরেদের গাছ কাটার সরঞ্জাম কেড়ে নিতে থাকেন।
বহুগুনা লিখেছেন, বন ধ্বংসের কারণে উর্বর ভূমি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে আর গ্রামের পুরুষরা কাজের সন্ধানে শহরে ভিড় করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর সে কারণেই কৃষিকাজ বাদ দিয়ে গবাদিপশুর খাদ্য, জ্বালানি এবং পানি সংগ্রহের মতো সব দায়িত্ব নিতে বাধ্য হচ্ছেন নারীরা। ফলে নারী অধিকার রক্ষার আন্দোলনে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হয়ে ওঠে চিপকো আন্দোলন। কয়েক বছরের মধ্যেই বহুগুনা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও নারীরা দলে দলে যোগ দিতে থাকেন। তারা শান্তিপূর্ণ মিছিল, গাছ আলিঙ্গন ও অনশন করতে থাকেন।
তার আন্দোলনের কারণে ১৯৮১ সালে উত্তরাখন্ডে বাণিজ্যিকভাবে গাছ কাটার ওপর ১৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। দুই বছর পর পরিবেশগত সংকটের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে হিমালয় এলাকায় চার হাজার কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দেন তিনি।
