প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনাভাইরাসের টিকা সংগ্রহের পাশাপাশি দেশে উৎপাদনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে বিভিন্ন দেশ ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বেগম মনিরা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
এছাড়া সংসদে দুজন সংসদ সদস্য, সাবেক কয়েকজন সংসদ সদস্য ও বিশিষ্টজনের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়। এদিকে গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কপ-২৬-এর প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী শর্মাকে জানান, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পাশে থাকবে যুক্তরাজ্যÑএমন প্রত্যাশা বাংলাদেশের।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার করোনা মহামারী থেকে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশব্যাপী ও অঞ্চলভিত্তিক লকডাউন কার্যকরসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষকে ত্রাণ সহযোগিতা প্রদানসহ জীবিকা ও অর্থনীতি বাঁচাতে সরকার বিভিন্ন প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনসহ করোনা মোকাবিলায় ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের জন্য সুরক্ষাসামগ্রী প্রদান, আর্থিক প্রণোদনা প্রদান, যথাসময়ে টেস্টিং কিট আমদানি এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ল্যাব স্থাপনসহ করোনা পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করায় ভাইরাসের বিস্তার রোধে দক্ষিণ এশিয়াসহ অনেক উন্নত দেশের চেয়ে বাংলাদেশ সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশ্বের যেসব দেশ টিকাদান কার্যক্রম প্রথমদিকে শুরু করতে সক্ষম হয়, বাংলাদেশ তার অন্যতম। যথাসময়ে করোনার টিকাপ্রাপ্তির বিষয়ে সরকার শুরু থেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। টিকা সংগ্রহে সরকার কর্র্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহ হলোÑ সরকার কর্র্তৃক ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট হতে সংগৃহীত এবং ভারত সরকারের কাছ থেকে উপহার হিসেবে প্রাপ্ত মোট ১ কোটি ২ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দ্বারা করোনা টিকাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ১৮ মে পর্যন্ত দেশের চল্লিশোর্ধ্ব ও সম্মুখসারির বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে মোট ৯৬ লাখ ৪১ হাজার ৩১২ ডোজ টিকা প্রদান করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ভারত হতে টিকা সংগ্রহের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভারতে করোনা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটায় এপ্রিলে ভারত সরকার টিকা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে বাংলাদেশ সরকার কর্র্তৃক বিকল্প উৎস হিসেবে চীন ও রাশিয়া থেকে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে চীনের সিনোফার্ম থেকে টিকা ক্রয়ের বিষয়টি মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন করা হয়েছে। জুন, জুলাই ও আগস্ট; প্রতিমাসে ৫০ লাখ করে টিকা চীন থেকে পাওয়া যাবে। চীন সরকারের কাছ থেকে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের পাঁচ লাখ ডোজ উপহার হিসেবে পাওয়া গেছে। এসব ভ্যাকসিন প্রদানের কাজ ২৫ মে শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও), কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি হতে ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় জরুরিভিত্তিতে ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি বরাবর পত্র পাঠিয়েছে। সরকার রাশিয়া হতে টিকা আমদানির জন্যও ইতিমধ্যে আনুষঙ্গিক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। মহামারী মোকাবিলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভ্যাকসিন সংগ্রহের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দেশ ও ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ চলছে।
দুই এমপির মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গৃহীত : চলতি সংসদের সদস্য আবদুল মতিন খসরু ও আসলামুল হক, সাবেক কয়েকজন সংসদ সদস্যের মৃত্যু ও বিশিষ্টজনের মৃত্যুতে সংসদে গতকাল শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রীসহ সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন। মারা যাওয়া সাবেক সংসদ সদস্যরা হলেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী, মেরাজ উদ্দিন মোল্লা, গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন, খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ, আবুল হাসেম, মাহবুবুর রহমান, মোহাম্মদ ইউনুস, জিয়াউর রহমান খান, আব্দুল বারী সরদার, দিলদার হোসেন সেলিম, আব্দুর রউফ খান, ফরিদা রহমান।
ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী, বাংলা একাডেমির সাবেক সভাপতি শামসুজ্জামান খান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মা ফৌজিয়া মালেক, শিশুবিশেষজ্ঞ ডা. সাহিদা আখতার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি হাসান শাহরিয়ার, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক, লোকসংগীত শিল্পী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, অভিনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম মহসীন, পরিবেশ অধিদপ্তরের একেএম রফিক আহাম্মদ, সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা হারুন-উর-রশিদ, অভিনেতা ওয়াসিমের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করা হয়। এছাড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দেশ-বিদেশে যারা মারা গেছেন তাদের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করা হয়। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌদুর্ঘটনা, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি হামলায় নিহত, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ভারত ও বাংলাদেশে হতাহতদের জন্যও শোকপ্রকাশ করা হয়।
শোকপ্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্যালেস্টাইনে যে ঘটনা ঘটেছে সেই ঘটনা সত্যিই অমানবিক। ছোট্ট শিশুদের কান্না এবং তাদের সেই অসহায়ত্ব, মাতৃ-পিতৃহারা হয়ে ঘুরে বেড়ানোÑএটা সহ্য করা যায় না। ইসরায়েল এভাবে আগেও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। ফিলিস্তিনে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্যালেস্টাইনের ভাইদের সঙ্গে সব সময়ই আছি। আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা আমরা অতীতেও করেছি এখনো আমরা করে যাচ্ছি, অবশ্যই করে যাব। যারা অনেক সময় মানবতার এত কথা বলে, কিন্তু এই সময় অনেকেই চুপ থাকে। আন্তর্জাতিক বহু সংস্থা এখন আর কথা বলে নাৃসেটাই আমার প্রশ্ন।’
প্রয়াত আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুকে স্মরণ করে সংসদে শেখ হাসিনা বলেন, ‘(জাতির পিতাকে হত্যার পর) আমাদের বিচার চাওয়ার অধিকার ছিল না। সেই অধিকারটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি যে কষ্ট করেছেন, মামলা পরিচালনা করার জন্য কিংবা সকলে মিলে যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই। তার (মতিন খসরু) ভেতরে আমি দেখেছি সবসময় একটা শক্তি ছিল। কারণ এই মামলা করাটা এত সহজ ছিল না, অনেক বাধা ছিল। কিন্তু তারপরও তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেছিলেন। সেটা আমি সব সময় স্মরণ করি।’
আসলামুল হকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্দোলন, সংগ্রাম, সব কিছুতেই তিনি ভূমিকা নিয়েছিলেন। এলাকার জন্য কাজ করে বারবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তার অন্যরকম একটা দরদ ছিল এবং এলাকার উন্নয়নের জন্য সব থেকে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।’
জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পাশে যুক্তরাজ্য : এদিকে গতকাল গণভবনে কপ-২৬-এর প্রেসিডেন্ট অলোক শর্মা সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাজ্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবে বলে আশা করে বাংলাদেশ। বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতি, এর বৈশ্বিক বিরূপ প্রভাব, অভিযোজন, প্রশমন এবং জলবায়ু তহবিল এবং করোনা মহামারীসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়।
এহসানুল করিম বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশসহ জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণের হার খুবই কম। তবু আমরা আক্রান্ত হচ্ছি।
ক্লাইমেট ভালনার্যাবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন অলোক শর্মা। প্রধানমন্ত্রীকে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী কপ-২৬ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান তিনি। প্রেস সচিব আরও জানান, গ্রিন এনার্জির গুরুত্ব তুলে ধরে অলোক শর্মা বলেন, সবাইকে গ্রিন এনার্জির দিকে যেতে হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট ডিকসন।
