সিভিল এভিয়েশনের প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়ে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পর্যন্ত গিয়েছিল ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকায় অত্যাধুনিক রাডার ক্রয়ের প্রস্তাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে প্রস্তাবটি বাতিল হয়। এখন এ রাডার কেনা হচ্ছে ৬৩০ কোটি টাকায়।
২০১৭ সালের ওই ঘটনা সম্পর্কে তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রাডার কেনায় দাম বেশি হওয়ায় আমিই প্রথম আপত্তি তুলেছিলাম। পরে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করি। তার নির্দেশে ওই প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুনভাবে রাডার ক্রয় করার কাজ শুরু করি। কাউকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমার সময় কোনো সিন্ডিকেট ছিল না। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে বেবিচকের প্রতিটি কাজই সম্পন্ন করা হয়েছে।
১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকায় রাডার কেনার প্রস্তাব বাতিল করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে উন্নতমানের রাডার ক্রয় করার উদ্যোগ নেয় সিভিল এভিয়েশন। চার বছরের মাথায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাডার স্থাপন করা হচ্ছে। চলতি মাসের যেকোনো দিন ফ্রান্সের থালেস কোম্পানির সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী তিন বছরের মধ্যেই রাডারটি স্থাপন করার পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে সব জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে রাডার প্রকল্পও অনুমোদিত হয়ে গেছে। সম্প্রতি সরকারের ক্রয় কমিটি সভায় তা অনুমোদন দেওয়া হয়।
সিভিল এভিয়েশনের সূত্রগুলো জানায়, বিশ্বের সর্বাধুনিক রাডার নির্মাতা প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্সের থালেস কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পরপরই শুরু হয়ে যাবে রাডার বসানোর আনুষ্ঠানিক যাত্রা। রাডার বসানোর পর দেশের এভিয়েশন খাতে যোগ হবে নতুন মাইলফলক। ৬৩০ কোটি ৪০ লাখ ৩২ হাজার টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে নিরাপদ বিমান চলাচল আরও নির্বিঘ্ন, নিশ্চিত ও বিশ্বমানে উন্নীত হবে। মূলত নেভিগেশন সিস্টেমকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপদ আকাশে চলাচলের জন্যই সিএনএস-এটিএম নামে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বিশ্বমানের থালেস কোম্পানি ইতিমধ্যে বেসামরিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাডার প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাসম্ভব অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বহুল আলোচিত এ রাডার প্রকল্প নিয়ে অনেক নাটকীয়তা ও প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছিল। ফ্রান্সের সঙ্গে জি-টু-জি পদ্ধতিতে রাডার বসানোর প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। মূলত তার দূরদর্শিতার কারণে রক্ষা পাবে ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী ফ্রান্সের কাছ থেকে সরাসরি জি-টু-জি পদ্ধতিতে রাডার কেনার সিদ্ধান্ত নেন।
জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাডার বসানোর পর দেশের এভিয়েশন খাতের রাজস্বই বেড়ে যাবে। একদিকে নিরাপদ বিমান চলাচল অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি দেশের উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেও স্বীকৃতি পাবে। রাডার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিনের। নিরাপদ বিমান চলাচলের জন্য রাডার ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম প্রধান বিবেচ্য স্থাপনা। এভিয়েশন জগৎ যতটা এগোচ্ছে, রাডার ও ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমও ততই আধুনিক হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিভিল এভিয়েশনও হাতে নিয়েছে বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত এ প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সমুদ্রসীমার ওপর দিয়ে চলাচলকারী অনেক বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের আওতায় আসবে। এতে শুধু রাডার ব্যবস্থাপনার কারণেই বেড়ে যাবে সিভিল এভিয়েশনের রাজস্ব। সেই সঙ্গে নিশ্চিত হবে নিরাপদ আকাশপথ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে বর্তমান ভিআইপি গেটের পাশেই ছিল। কিন্তু আমাদের পছন্দের হচ্ছে বলাকা ভবনের সামনে এমন একটি দৃষ্টিনন্দন টাওয়ার যাতে সবার নজর কাড়ে। বর্তমানে এখানে সয়েল টেস্ট চলছে। টাওয়ারের উচ্চতা হবে ৫৫ মিটার। সবদিক থেকেই এটাই বেস্ট সাইট। আমরা চেষ্টা করছি চলতি মাসের যেকোনো দিনই চুক্তি করতে। আশা করি চুক্তিটি হয়ে যাবে। এটি কেনা নিয়েও যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী বলেন, এ রাডার আরও অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বিলম্বে হলেও প্রকল্প শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পেয়েছে এটা অবশ্যই সিভিল এভিয়েশনের ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক। আগের প্রকল্পের চেয়ে বর্তমান প্রকল্পের মাধ্যমে রাডার সংগ্রহ করা হলে কমপক্ষে হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি সাশ্রয় হচ্ছে। প্রকল্পটি হলে সরকারের ‘ভিশন-২১’ বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবে আরও একধাপ। নিরাপদ হবে দেশের আকাশসীমা ও বিমান চলাচল ব্যবস্থা।
বেবিচকের মেম্বার ফ্লাইট সেফটি গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরী জিয়াউল কবীর বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি করার টার্গেট রয়েছে। তারপর আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হবে। অনুমোদন হয়ে যাওয়ার পর এখন শুধু রাডার বসানোর দৃশ্য দেখার অপেক্ষায়। চুক্তি অনুসারে সবকিছু স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলে আগামী ৩০ মাসের মধ্যেই প্রকল্পটির সব কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
বিশ্বের সর্বাধুনিক এ রাডার প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ওয়াম সার্ভিলেন্স অব ইইজেড, এইচ এফ ট্রান্সমিটার, থ্রিডি টাওয়ার সিমুলেটর, নাভায়েডস, কন্ট্রোলারস রোস্টার ম্যানেজমেন্ট টুল বিজেড টুলস। এটি আধুনিক রাডার ও নেভিগেশন সিস্টেম হিসেবে পরিচিত। নিরাপদ বিমান চলাচল নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাপী অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তি আবশ্যক। বাংলাদেশের আকাশসীমায় বিমান চলাচল নিরাপদ রাখতে এ ধরনের অত্যাধুনিক মানের রাডার স্থাপনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে আইকাওর। এটা বাস্তবায়ন থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুততম সময়ে রাডার প্রকল্প করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৭ সালের ১ মার্চ ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রাডার ক্রয় করতে অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ১০ বছর মেয়াদি চুক্তিতে অনুমোদনের ফাইল পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আকাশচুম্বী দাম দেখে তিনি নিজেই খোঁজ নেন। পরে জানতে পারেন, যে রাডারের কথা বলা হচ্ছে সেটি ৬৫৮ কোটি টাকা দিয়েই ক্রয় করা সম্ভব। বাতিল করে দেন ওই অনুমোদনটি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমেরিকার একটি কোম্পানির নাম করে সিন্ডিকেটটি বেশি টাকার কাজটি ভাগানোর চেষ্টা করেছিল। মূলত ওই কোম্পানির আড়ালে ছিল বাংলাদেশের একটি কোম্পানির নাম। আর সেটি হচ্ছে করিম অ্যাসোসিয়েটস। এই অ্যাসোসিয়েটসের মালিক ফাহাদ করিম এখন আমেরিকা আছেন বলে আমরা জানি। ওই রাডারটিই এখন ৬৩০ কোটি টাকাতেই কেনা হচ্ছে। অথচ আগের দামে কেনা হলে ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা চলে যেত সিন্ডিকেটের পকেটে।
বর্তমান বিশ্বে হাতেগোনা কয়েকটি রাডার নির্মাতা কোম্পানির মধ্যে ফ্রান্সের থালেস সবার শীর্ষে। বিশ্বের বিমানবন্দরের মধ্যে অধিকাংশই থালেসের রাডার ব্যবহার করছে। কোম্পানিটি বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ সফল উৎক্ষেপণ করে। এর আগে ১৯৮০ সালেও জি-টু-জির ভিত্তিতে থালেস বাংলাদেশে রাডার ও নেভিগেশন সিস্টেম চালু করে, যা এখন পর্যন্ত চালু রয়েছে ও বিমানের নিরাপদ উড্ডয়ন অবতরণ নিশ্চিত করছে। ২০০৫ সালে বিমানবন্দরে পুরনো রাডার প্রতিস্থাপনে উদ্যোগ নেয় বেবিচক। ২০১২ সালে পিপিপির আওতায় রাডার স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন দিলে ২০১৫ সালে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখানোয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় তা বাতিল করে দেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ২০১৭ সালের ১ মার্চ পিপিপির পরিবর্তে সরকারি অর্থায়নে সাপ্লাই ইনস্টলেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন অব মাল্টি-মোড সার্ভিলেন্স সিস্টেম (রাডার, এডিএস-বি) এটিএস অ্যান্ড কমিউনিকেশন সিস্টেম শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এ প্রকল্পেরই নতুন নামকরণ করা হয়েছে সিএনএস-এটিএম প্রকল্প। এর আগে মন্ত্রিসভা কমিটিতে পিপিপির প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দর প্রস্তাব করা হয়েছিল ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ৩৮ বছরের পুরনো রাডার দিয়ে চলছে দেশের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণের কাজ। একই সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের রেডিও ব্যবস্থাও পুরনো হওয়ায় মাঝেমধ্যে দেখা দেয় বিপত্তি। আর পুরনো রাডারের কারণে বিভিন্ন সীমানায় উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজগুলো মাঝেমধ্যে শনাক্ত করতে হিমশিম খেতে হয়। পাশাপাশি ঠিকভাবে চার্জও আদায় করা যায় না। তিনি আরও বলেন, ২০০৫ সাল থেকে নতুন রাডার স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ আমেরিকার একটি কোম্পানি রাডার স্থাপন করতে আগ্রহ প্রকাশ করে একটি আবেদন করেছিল। কিন্তু তারা বাজেট বেশি ধরেছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সেই আবেদন বাতিল করে দেয়।