মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থান লক্ষ্য করে দেশটির সরকারি বাহিনী নজিরবিহীন বিমান হামলা ও তীব্র গোলাবর্ষণ শুরু করেছে। ওপারে যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার থেকে ভারী বোমার বিকট শব্দে থরথর করে কেঁপে উঠছে টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত এলাকা। সংঘর্ষ চরম রূপ নেওয়ায় নতুন করে বড় ধরনের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাফ নদ ও স্থলসীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে টহল জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্ট গার্ড।
সরেজমিন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও চৌধুরীপাড়া সীমান্ত এলাকা ঘুরে থমথমে পরিস্থিতি দেখা গেছে। এপারের নাফ নদসংলগ্ন গ্রামগুলোর সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং স্থানীয় জেলেরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নাফ নদের বাংলাদেশ অংশে মাছ ধরছে। ওপারে মংডু শহরের আকাশে জান্তা বাহিনীর যুদ্ধবিমানের চক্কর এবং দফায় দফায় বোমাবর্ষণের পর বিশাল কালো ধোঁয়ার কু-লী এপার থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিমান হামলা ও তীব্র সংঘাতের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। ওপারে বিস্ফোরণের ঘটনায় আমাদের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নতুন করে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা রোহিঙ্গা ঢল ঠেকাতে নাফ নদসহ স্থলসীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক কড়া নজর রাখা হয়েছে। বিজিবি সদস্যরা জল ও স্থলপথে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি ড্রোন প্রযুক্তির সাহায্যে সার্বক্ষণিক আকাশ পর্যবেক্ষণ করছে। যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি ও সীমান্ত লঙ্ঘন ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে সব প্রস্তুতি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে।’
মানুষের মনে চরম আতঙ্ক : টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং, হ্নীলা, টেকনাফ পৌরসভা ও সাবরাং ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা গত ১ জুলাই রাতে, ২ জুলাই বিকাল ও রাতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আকাশপথে বিমান হামলার বিকট শব্দ শুনতে পেয়েছে। সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারা উৎকণ্ঠার মধ্যে রাত কাটাচ্ছে।
শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা জাহেদ করিম বলেন, গত বৃহস্পতিবার বিকাল ও রাতেও মংডু শহরে বিমান হামলা হয়েছে। একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে আমাদের বাড়িঘর কেঁপে ওঠে। দীর্ঘদিন পর হঠাৎ এত বড় হামলায় পরিবারের সবাই ভয়ে আছে।
টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী ঘাট বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, ‘নাফ নদের ওপারে মিয়ানমারের মংডু শহরে বিমান হামলা ও গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত জেলেরা মাছ শিকারে যাচ্ছে না। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তখন জেলেরা সাগরে নামবেন। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।’
টেকনাফের হ্নীলা জাদিমুড়া রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা মনির উল্লাহ দাবি করেন, মিয়ানমারের বুথিডং এলাকার চারলাইন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে জান্তা বাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য, চলমান হামলার কারণে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সীমান্তসংলগ্ন টেকনাফের হ্নীলা জনপদের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী জানান, ‘মিয়ানমারের ভেতরে লাগাতার বিমান হামলা ও মর্টার শেলের বিস্ফোরণের তীব্রতা এবার অনেক বেশি। গত দুদিন ধরে গভীর রাতে হঠাৎ হঠাৎ বিকট শব্দে হ্নীলাসহ সীমান্তবর্তী এলাকার ঘরবাড়ি, জানালার কাচ ও দেওয়াল কেঁপে উঠছে। সেই শব্দের পর থেকে সীমান্ত এলাকার লোকজনের আতঙ্কের মধ্যে দিন যাচ্ছে। এতে আমাদের এলাকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি রাতে বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে অনেক শিক্ষার্থী ও শিশু ভয়ে কান্না শুরু করে দিচ্ছে।’
ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ওপারে যুদ্ধের তীব্রতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সীমান্তবাসী নিরাপত্তার অভাব বোধ করছে। আমরা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছি। পাশাপাশি নাফ নদে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজিবি ও কোস্ট গার্ড সীমান্তে কড়া পাহারা বসানোয় আমরা আশ্বস্ত, তবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সীমান্ত এলাকায় ঘোরাঘুরি না করার জন্য এবং যেকোনো সন্দেহজনক পরিস্থিতি দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।