মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব

আপডেট : ১৩ জুন ২০২১, ১২:২১ এএম

আল্লাহতায়ালা জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং সবার প্রয়োজন মেটানোর জন্য রিজিক, ভোগ-সামগ্রী, আসবাবপত্র, সাজ-সরঞ্জাম, ধন-সম্পদ ও পশু-পাখি ইত্যাদি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির কল্যাণ ও উপকারার্থে এবং সুনির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত জীবন অতিবাহিত করার জন্য এই ধরণীকে তিনি উপযোগী ও অনুকূল করেছেন। এসব বিষয়ে নিয়ে কোরআনে কারিমের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বর্ণনা রয়েছে। এসব বর্ণনার একপর্যায়ে মহান আল্লাহ মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আর যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামতকে গণনা করতে চাও, তোমরা তা পরিমাপ করতে পারবে না।’ সুরা নাহল : ১৮

বাস্তবেই আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতরাজি গণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ এই জগৎকে পরিপূর্ণ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে সৃষ্টি করেছেন। তাতে সবার জীবনোপকরণের জন্য পর্যাপ্ত সামগ্রী সরবরাহ করেছেন, প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন উপকারী বস্তু ও উপকরণকে অনুকূল করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে মানবসম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এ জগৎকে অযথা সৃষ্টি করেননি এবং এমনিতেই ছেড়ে দেবেন না ও তাকে এড়িয়ে যাবেন না। আর সৃষ্টির পর আল্লাহ তার সৃষ্টিকে (দুনিয়া) অন্যের কাছে সঁপে দেননি, বরং তিনি এই দৃশ্যমান জগৎকে এক চরম সত্যের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তা হলো তারই একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা, সব ইবাদত তার জন্য সম্পাদন করা, কল্যাণ সাধন ও পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন করা। এ প্রসঙ্গে তিনি ইরশাদ করেন, ‘আমি জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি কেবলমাত্র আমারই ইবাদতের জন্য। আমি তাদের কাছ থেকে কোনো রিজিক চাই না। আর এটাও চাই না যে, তারা আমাকে খাওয়াবে। নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই তো রিজিকদাতা, প্রবল শক্তিধর, পরাক্রমশালী।’ সুরা যারিয়াত : ৫৬-৫৮

সৎ ও আনুগত্যমূলক কাজের মাধ্যমে পৃথিবীকে বসবাস উপযোগী এবং তাকে শিরকের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত করতে আল্লাহ যুগে যুগে বহু নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। দুনিয়ায় প্রেরিত নবী-রাসুলদের মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা জীবনে তাই উপভোগ করে যা আল্লাহ তাদের জন্য হালাল করেছেন এবং তারা যেন আনুগত্যমূলক ভালো কাজে অবিচল থাকেন, যা ছাড়া পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নবী-রাসুল ও তাদের অনুসারী মুমিনরা এই পৃথিবীকে সৎ আমল ও কল্যাণ সাধনের স্থান ও কাল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে তারা দুনিয়ায় কল্যাণ ও আখেরাতে জান্নাত লাভে ধন্য হবেন। সৎ আমলের সুফল মূলত ব্যক্তি নিজের ও অন্যদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়, বিশেষ করে ইসলামের পাঁচটি রুকনের ওপর আমলের দ্বারা। অন্য ইবাদতগুলো এই পাঁচ রুকনের (স্তম্ভ) অধীন। সুতরাং কোনো ভালো আমলকে ছোট করে দেখবেন না, কেননা আপনি তো জানেন না কোন আমলের বিনিময়ে জান্নাত লাভ করবেন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবেন। হাদিসে এসেছে, হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। আর নিশ্চয় তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও একটি ভালো কাজ।’ সহিহ্ বোখারি ও মুসলিম

আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত মুমিন-মুসলমানরা এই জগৎকে সৎকর্মের স্থান ও উপযুক্ত সময় হিসেবে গ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে না, বরং কুফরি করেছে সে এই পার্থিব জগৎকে প্রবৃত্তি চারণ, হারাম কাজ, ভোগ-বিলাস ও পাপাচারের স্থান হিসেবে গ্রহণ করেছে।

সবচেয়ে বড় পাপ হলো আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। শিরকের পরে ভয়াবহতম অপরাধ ও পাপ হলো কবিরা গোনাহসমূহ। বান্দা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, জেনে-না জেনে কোনো পাপ করে যখন সে নিজের ওপর জুলুম করে, যা তার ও আল্লাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ, অতঃপর তওবা করে; তখন আল্লাহ তার গোনাহকে ক্ষমা করে দেন। আর যদি বান্দার (মানুষের) সঙ্গে জুলুম করে, তবে মজলুমকে তার হক (অধিকার) ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। এমনকি সেদিন হলেও যেদিন (কিয়ামতের দিন) কোনো টাকা-পয়সা থাকবে না, জালেম ব্যক্তির কোনো নেকি থাকলে সেদিন মজলুমকে দিয়ে দেওয়া হবে, এভাবে যদি তার নেকি শেষ হয়ে যায় তখন মজলুম ব্যক্তির গোনাহগুলো তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সুতরাং সাবধান, যাবতীয় গোনাহ থেকে বেঁচে থাকুন, যদিও তা আপনার চোখে ছোট অপরাধ হয়। কেননা সেটার জন্যও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। যেসব আমল গুনাহ মিটিয়ে দেয়, নেকি বৃদ্ধি করে, সৎ আমলগুলোকে আরও পরিশীলিত করে, আমলের ঘাটতি পূর্ণ করে এবং শয়তানকে বিতাড়িত করে, তার অন্যতম হচ্ছে সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকির করা। মুখে জিকিরের সঙ্গে সঙ্গে সর্বাবস্থায় আল্লাহ আপনাকে দেখছেন, আপনি আল্লাহর দৃষ্টিরে বাইরে নন এ অনুভূতি নিজের ভেতরে জাগ্রত করুন। এমন চিন্তা পাপকাজ থেকে মানুষকে দূরে রাখে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদাররা! ‘তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো। আর সকাল-সন্ধ্যা তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।’ সুরা আহজাব : ৪১-৪২

ইসলাম ধর্ম যেসব মূলনীতির প্রতি মানুষকে আহ্বান করে তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো একতাবদ্ধতা ও বন্ধুত্বতা বজায় রাখা, বিবাদ ও দলাদলি পরিহার করে চলা এবং নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, উদারতা ও শান্তি কামনা করা। সেই সঙ্গে মানুষের সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা, যাবতীয় সংঘাত, কোন্দল ও বিভাজন পরিহার করা।

১১ জুন শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত