করোনা পরীক্ষার কম হার বা হাসপাতালের বাইরে মৃত্যুর সব ঘটনা নথিভুক্ত না হওয়ায় মহামারীতে প্রকৃতপক্ষে কত লোক প্রাণ হারিয়েছে তার সঠিক চিত্র নিয়ে সংশয় আছে শুরু থেকেই। বিভিন্ন দেশের সরকার সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে তথ্য দিচ্ছে প্রকৃত সংখ্যার সঙ্গে তার মিল নেই বলে আগেই অনেক সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এবার আন্তর্জাতিক সাময়িকী ইকোনমিস্টও একই দাবি করল। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, বিশ্বজুড়ে করোনায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশিত তথ্যের চাইতে অন্তত তিনগুণ বেশি। বিভন্ন দেশের সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ওয়ার্ল্ডোমিটারস ও জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় গতকাল পর্যন্ত বিশ্বে করোনায় ৩৮ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। অথচ বিশেষ মডেলিংয়ের মাধ্যমে ইকোনমিস্টের করা হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ।
প্রতিবেদনটিতে উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি পরিসংখ্যানের কথা বলেছে ইকোনমিস্ট। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত বছরের ২৭ মার্চ থেকে দেশটিতে এ মহামারীতে মারা গেছে ৫৮ হাজার মানুষ। তবে গত ৮ মে পর্যন্ত আগের এক বছরে দক্ষিণ আফ্রিকায় অতিরিক্ত ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৯৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এক বছরে বাড়তি এত মানুষের মৃত্যুর এই চিত্র অতীতে মানুষের মৃত্যুর স্বাভাবিক ধারা থেকে ভিন্ন রকমের। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মকর্তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এক বছরে এ বাড়তি মানুষের ৮৫-৯৫ শতাংশের মৃত্যুর পেছনে রয়েছে সার্স-কোভ-২ বা করোনাভাইরাস। আর সেক্ষেত্রে দেশটিতে করোনায় প্রকৃত মৃতের সংখ্যা হবে তিনগুণ বেশি। ইকোনমিস্ট বলছে, ঘাটতির চিত্র শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য প্রযোজ্য নয়। করোনায় মারা যাওয়া বাড়তি মানুষের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানে যোগ না হওয়ার ঘটনা বিশ্বের সব দেশে না ঘটলেও অধিকাংশ দেশে ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও করোনায় মৃত মানুষের বাড়তি সংখ্যা সরকারিভাবে ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
আরও কয়েকটি দেশে গবেষণায় এমন গরমিল প্রমাণিত হয়েছে। যেমনÑ যুক্তরাজ্যে দেখা গেছে, করোনার প্রথম দফা ঢেউ চলাকালে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে বেশি। কিন্তু দ্বিতীয় দফার ঢেউয়ে তা ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে কম। কারণ, দ্বিতীয় দফায় করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাতে অন্য বছর মৌসুমি ফ্লুর মতো রোগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এ বছর এমন রোগে আক্রান্ত হওয়া মানুষকে বাঁচানো গেছে। দ্বিতীয় দফা করোনার ঢেউয়ে মৃতের হিসাব অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিষয়টি সেভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ফ্রান্সেও প্রায় একই রকম চিত্র দেখা গেছে। করোনায় দেশে দেশে মৃত মানুষের বাড়তি সংখ্যা বৈশ্বিক গণনায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার পেছনে অধিকাংশ দেশ, বিশেষত বেশিরভাগ দরিদ্র দেশের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ কারণ রয়েছে। তা হলোÑ বাড়তি সংখ্যার হিসাব দেশগুলো সময়মতো সরবরাহ করে না। বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সরবরাহ করা তথ্যই শুধু ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ধনী দেশে মৃতের সংখ্যা সরকার ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে ১ দশমিক ১৭ গুণ বেশি। সাব-সাহারা অঞ্চলে মৃতের এই আনুমানিক হার ১৪ গুণ বেশি। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে করোনার প্রথম এবং দ্বিতীয় দফার চিত্র এই মডেলের পরিসংখ্যানে তুলনামূলকভাবে অনেক কম দৃশ্যমান হয়েছে।
