করোনার সংক্রমণ রোধে বিধিনিষেধের কারণে বিচারিকের পাশাপাশি প্রায় আড়াই মাস বন্ধ রয়েছে শিশু আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম। বিচারকাজ বন্ধে এক হাজারের বেশি শিশু বিচারপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও ভার্চুয়ালি হাজতি আসামি ও শিশুদের জামিন শুনানি হচ্ছে এবং এতে অনেকের জামিন মিলছে।
শিশু অধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, উন্নয়নকেন্দ্রের আবদ্ধ পরিবেশে শিশুরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। এদের বেশির ভাগ লঘু অপরাধে অভিযুক্ত এবং বিচারে তারা খালাস পেত। এটি হলে কেন্দ্রগুলোর চাপ কমে বসবাসের পরিবেশ উন্নত হবে। এ জন্য জামিন শুনানির পাশাপাশি ভার্চুয়ালি শিশু আদালতের বিচারকাজ চালিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা পরিস্থিতিতে গত ৫ এপ্রিল থেকে মানুষের চলাচল ও কার্যক্রমের ওপর সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করে। ওই দিন থেকে বিচারিক ও শিশু আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী, আইনের সঙ্গে সংঘাত বা আইনের সংস্পর্শে আসা শিশুদের কারাগারে না পাঠিয়ে উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানো হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও বিদ্যমান শিশু আইন অনুযায়ী, আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর বিচার হবে শুধুই শিশু আদালতে।
বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে গাজীপুরের টঙ্গী ও কোনাবাড়ী এবং যশোরে একটিসহ মোট তিনটি শিশু উন্নয়নকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে টঙ্গী ও যশোরের কেন্দ্র দুটি বালক; কোনাবাড়ীর কেন্দ্র বালিকাদের।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও শিশু অধিকারকর্মীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, সারা দেশে ভার্চুয়াল আদালতে প্রতিটি কার্যদিবসে শিশুরা যেমন জামিন পাচ্ছে, তেমনি বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে তাদের উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। এতে করে কেন্দ্রের ওপর চাপ বাড়ছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তিনটি শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে ১ হাজার ৯ শিশু। এদের মধ্যে কন্যাশিশু ৪৩ জন। মামলার পর সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে এমন মামলা শতাধিক। আর বিচারের রায়ে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে এমন ১৩ শিশুও উন্নয়নকেন্দ্রে বসবাস করছে।
শিশু অধিকারকর্মী ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এমনিতেই খালাস পেত এমন শিশুদেরও কেন্দ্রের আবদ্ধ পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। এতে তারা অসিহষ্ণু হয়ে উঠছে। নানা অপ্রীতিকর ও সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। সম্প্রতি যশোর শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে মারামারিও হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালে বিচারের অপেক্ষায় থাকা শিশুদের অনেকেই লঘু অপরাধে অভিযুক্ত। বিচারকাজ চললে তাদের বেশির ভাগ খালাস পেয়ে বেরিয়ে যেত। এতে সংশোধনাগারের চাপ কমত। এটি না হওয়ায় প্রতিনিয়ত শিশুদের মধ্যে মারামারি, নিজেকে নিজে আঘাত করা, পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। একই কারণে তাদের দিকে বাড়তি নজর দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।’
এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রকিব আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবদ্ধ অবস্থায় অসিহষ্ণুতাসহ শিশুদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, কেন্দ্রে শিশুরা ঝগড়া-বিবাদে জড়াচ্ছে। কেন্দ্রগুলোর চাপ কমাতে ভার্চুয়ালি শিশু আদালতের বিচারকাজ চালিয়ে নিলে ভালো হবে।’
আইনজীবীরা বলছেন, শিশু আইন অনুযায়ী ৯ বছরের কম বয়সীদের কোনো অপরাধ অভিযোগ হিসেবে গণ্য হয় না। ১০ থেকে ১৮ পর্যন্ত বয়সীদের অপরাধ অভিযোগ হিসেবে বিবেচ্য হয় এবং এ বয়স খুব সংবেদনশীল। এ সময়ে শিশুর পারিবারিক সান্নিধ্য, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ব্যাঘাত ঘটলে শিশুরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তারা বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
শিশু অধিকার সংগঠন চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের (সিসিবি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার এম আব্দুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সংশোধনাগারগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। বাস্তবে এগুলো জেলখানা। স্কুল নেই, ভালো খাবার নেই, খেলাধুলার সুযোগও নেই। বেশি দিন সেখানে থাকলে শিশুর মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তার ওপর এখন মামলার বিচারকাজ হচ্ছে না। কিন্তু সংবিধান ও আইন অনুযায়ী শিশুর মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজও নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করছে।’
তিনি পরামর্শ দেন, ‘ভার্চুয়ালি শিশুদের সংশোধনাগারে রেখেই বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব এবং তা একান্তভাবে করা প্রয়োজন। সাধারণ হাজতির চেয়ে তাদের বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ এম জামিউল হক ফয়সাল বলেন, ‘বিচারকাজ বন্ধ থাকায় শিশুরা পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখন তো ভার্চুয়ালি আদালতের অনেক কার্যক্রম হচ্ছে। একইভাবে শিশুদের বিচার কার্যক্রমও চালানো সম্ভব।’
শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রুত বিচার পাওয়া শিশুসহ সবার আইনি ও মৌলিক অধিকার। এগুলো থেকে কাউকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। বিচারের এক দিনের বেশি কাউকে জেলে বা উন্নয়নকেন্দ্রে আটকে রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মানুষটি ১৮ বছরের নিচে হলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।’
বিচারের অপেক্ষায় থাকা শিশুদের মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ওপর কোনো নির্দেশনা থাকলে তখনই কেবল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। আপাতত এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’
