আল্লাহতায়ালা তার সুনিপুণ সৃজন দক্ষতায় সৃষ্টিজগতের সবকিছুকে সুশোভিত করেছেন এবং তাতে সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা ঢেলে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যিনি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সৃজন করেছেন উত্তমরুপে।’সুরা সাজদাহ : ৭
মহান আল্লাহ চন্দ্র, সূর্য ও তারকারাজি দিয়ে আকাশকে সৌন্দর্যময় করেছেন। তিনি জমিনকে দৃষ্টিনন্দন করেছেন গাছ-গাছালি, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা ও ফুল-ফল দ্বারা। চতুষ্পদ জন্তুকে করেছেন মানুষের সাজ-সজ্জার উপকরণ। আর জগতের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সুন্দরতম সৃষ্টি হচ্ছে মানুষ। যাকে আল্লাহতায়ালা সুন্দর গঠন, উত্তম অবয়ব-চেহারা এবং সুষম আকৃতি ও অবস্থার সমন্বয়ে সুসজ্জিত করেছেন। তিনি মানুষকে সত্তাগত ও বৈশিষ্ট্যগত সৌন্দর্য দিয়েছেন। এ মর্মে তিনি বলেন, ‘যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করেছেন এবং সুসামঞ্জস্য করেছেন। যে আকৃতিতে চেয়েছেন, তিনি তোমাকে গঠন করেছেন।’ সুরা ইনফিতার : ৭-৮
সাজসজ্জা কিংবা সৌন্দর্য গ্রহণ এক ধরনের উপভোগ্য বস্তু ও নেয়ামত বিশেষ। এটা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, ভালো কাপড় পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, ভালোভাবে চলাফেরা করা ইসলামে নিষিদ্ধ কিছু নয়। পরিপাটি থাকা ও পরিমিত সাজসজ্জা গ্রহণের বিষয়ে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তিনি ছিলেন অধিক পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র মানুষ।
প্রিয় নবী (সা.) ছিলেন আকর্ষণীয় সৌন্দর্যের অধিকারী, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করতেন; তিনি সাজতেন তবে অপচয় ও বাড়াবাড়ি করতেন না, তিনি সুন্দর পোষাক পরতেন তবে তা খ্যাতি লাভের জন্য নয়, তিনি ঘন দাড়ি চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতেন ও তা পরিপাটি করে রাখতেন। কোনো প্রতিনিধিদল আগমন করলে তিনি সুন্দর জামা পরিধান করে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। হাদিসে এসেছে, হজরত বারা বিন আযেব (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) ছিলেন মাঝারি গড়নের। তার উভয়কাঁধের মধ্যস্থল প্রশস্থ ছিল। তার মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত (বাবরি চুল) বিস্তৃত ছিল। আমি তাকে লাল চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। আমি তার চাইতে অধিক সুন্দর ও সুশ্রী আর কাউকে দেখিনি।’ সহিহ্ বোখারি
একজন প্রকৃত মুসলিম বিভিন্ন উপলক্ষ ও অবস্থার সঙ্গে মানানসই ও উপযুক্ত সাজসজ্জা গ্রহণ করে থাকেন। আর কোনো মুসলমানের মনে এ বিষয়ে সংশয় সৃষ্টি করে না। তবে যেসব স্থানের জন্য সাজসজ্জা করা হয়, তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত স্থান হলো আল্লাহর ঘর তথা মসজিদ। কেননা এগুলো হলো, সবচেয়ে সুন্দরতম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় স্থান। তাইতো আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ করো।’ সুরা আরাফ : ৩১
হজরত হাসান বিন আলী (রা.) যখন মসজিদে যেতেন তখন ভালো ও সুন্দর পোষাক পরিধান করে যেতেন। এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন; তাই আমি আমার রবের জন্য সাজি; কেননা তিনিই তো বলেছেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ করো।’
একজন মুসলিম নিজেকে সেভাবেই সজ্জিত করে যেভাবে তার সম্মান, পদবী ও অবস্থার সঙ্গে মানানসই ও সঙ্গতিপূর্ণ হয়। হজরত মালেক বিন নায়লা আল জুশামি (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘একাদা তিনি নিম্নমানের কাপড় পরিধান করে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হলেন। তখন তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমার কি ধন-সম্পদ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আছে, সব রকমের সম্পদই আমার আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার কী ধরনের সম্পদ আছে? তিনি বললেন, আল্লাহতায়ালা আমাকে উট, ছাগল, ঘোড়া এবং দাস সবই দান করেছেন। তখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যেহেতু আল্লাহ তোমাকে সম্পদশালী করেছেন, কাজেই আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের নিদর্শন তোমার মধ্যে প্রকাশিত হওয়া উচিত।’ আবু দাউদ
নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যত্নের পাশাপাশি বাহ্যিক পরিপাটি থাকা সৌন্দর্য ও সাজসজ্জার অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, ‘একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) এলোমেলো চুলওয়ালা এক ব্যক্তিকে দেখে বললেন, লোকটি তার চুলগুলো আঁচড়ানোর জন্য কি কিছু পায় না? তিনি ময়লা কাপড় পরিহিত আরেক ব্যক্তিকে দেখে বললেন, লোকটি কাপড় ধোয়ার জন্য কি পানি পায় না?’ আবু দাউদ
রূপচর্চা কিংবা সাজসজ্জা বলতে ইসলাম কী বুঝায়? এ বিষয়ে যাবতীয় অস্পষ্টতা দূর করে তার সীমা, বৈশিষ্ট্য ও রূপরেখা তুলে ধরেছে ইসলাম। যেন মুসলিমরা সাজতে যেয়ে কোনো নিষিদ্ধ বিষয়ে জড়িয়ে না পড়ে, শরীরের বিকৃতি না ঘটায় অথবা এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ পোষাক পরিধান না করে যে কারণে আল্লাহতায়ালা তার ওপর অসন্তুষ্ট হন।
ইসলামি শরিয়তে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নারী-পুরুষের সাজসজ্জার মধ্যে পার্থক্যকারী বিষয়সমূহ থেকে সীমা লঙ্ঘনের ফলে ব্যক্তির দ্বীনদারি খর্ব হয়, চারিত্রিক ভিত্তি নষ্ট হয়, সততা ও ভদ্রতা নড়বড়ে হয়ে যায় এবং সম্মান ও শালীনতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর নানাবিধ কুপ্রভাব ও ক্ষতিকর পরিণতি রয়েছে। অনুরূপভাবে ইসলাম রুপচর্চা ও সাজসজ্জার নামে পরানুকরণ এবং অতিরঞ্জন করা থেকেও সতর্ক করেছে।
মুসলমানের করণীয় হলো যখন তারা সৌন্দর্য বর্ধনের ইচ্ছা করবে, সাজসজ্জার বিষয়ে উদ্যোগী হবে কিংবা আলাপ-আলোচনা করবে তখন এমন এক সৌন্দর্যের কথা মনে রাখবে; যা তাদের শারীরিক বিকাশ লাভে সহায়তা করে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পবিত্র রাখে এবং হৃদয়কে উন্নত করে। আর তা হচ্ছে, অন্তরকে ইমানের সাজে সজ্জিত করা। কেননা ইমানের সাজে সুশোভিত অন্তরই প্রত্যেক সুন্দর ও সৌন্দর্য বিচ্ছুরণের উৎস। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ইমানকে প্রিয় করেছেন এবং সেটাকে তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন। আর কুফরি, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের কাছে অপ্রিয়। তারাই তো সত্য পথপ্রাপ্ত। (এটা) আল্লাহর পক্ষ থেকে দান ও অনুগ্রহস্বরূপ; আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, হেকমতওয়ালা।’ সুরা হুজরাত : ৭-৮
হৃদয় যখন ইমানের সাজে সুশোভিত হবে, তখন ইমানদার ব্যক্তি হবে শ্রেষ্ঠ আত্মা ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী। তার আচার-আচরণ হবে উত্তম, তখন তার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সজ্জিত হবে, তার ভাষাও সুন্দর হয়ে যাবে। যা মানুষের হৃদয়কে বশ করে এবং মন জয় করে। এভাবেই তার দ্বীন ও দুনিয়ার সফলতা নিশ্চিত হবে।
মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, সর্বদা ইসলামের পথে চলা, তা জান্নাতের নেয়ামত লাভের মাধ্যম; যাতে রয়েছে সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যের সবকিছু। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমাদের যা কিছু দেওয়া হয়েছে তা তো দুনিয়ার জীবনের ভোগ ও শোভামাত্র। আর যা আল্লাহর কাছে আছে তা উত্তম ও স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না?’ সুরা কাসাস : ৬০
১৮ জুন, শুক্রবার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
