পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের শ্রেণিকক্ষ থেকে তুলে নিয়ে শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনা ধামাচাপা দিতে নির্যাতিত ছাত্রকেই নারী উত্ত্যক্তকারী সাজিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করছিল ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা। মারধরের পরপরই ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ফারজানা রহমান নামে এক নারী শিক্ষার্থীকে দিয়ে নির্যাতিত শরিফুল ইসলাম স্বাধীনের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অসত্য অভিযোগ তুলে থানায় লিখিত অভিযোগ দেয় তারা। পাবনার পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খানের নির্দেশে অধিকতর তদন্তে পুলিশ ওই নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি। পাশাপাশি স্বাধীনকে নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতা মেলায় তার বাবার জমা দেওয়া এজাহার তিন দিন পর গতকাল বুধবার মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেছে পুলিশ।
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ জুন পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজের বিভাগীয় প্রধান আলাউদ্দিন সরদারের উপস্থিতিতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম স্বাধীনকে শ্রেণিকক্ষ থেকে তুলে নিয়ে যায় কলেজ ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির দপ্তর সম্পাদক সুমন হোসেনের নেতৃত্বে কলেজ কমিটির সহসভাপতি রাজিব হোসেন আলিফ, সদ্য বিলুপ্ত সদর উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক সাব্বির আহমেদ জয়, জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি তপু রায়হান ও মইনুল হাসান মুন্নাসহ আট-নয় বহিরাগত সশস্ত্র যুবক। পরে তারা স্বাধীনকে পাশের জুবলী ট্যাংক মার্কেটের ছাদে নিয়ে মারধর শেষে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। পথচারীরা স্বাধীনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হলে তার বাবা শাহজাহান আলী থানায় এসে গত ২০ জুন ওই ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। এর আগে ১৫ জুন কলেজ ক্যাম্পাসে গায়ে হাত দিয়ে টানাহেঁচড়া ও কুপ্রস্তাব দেওয়াসহ শ্লীলতাহানির লিখিত অভিযোগ করেন ফারজানা। তাকে বাঁচাতেই ছাত্রলীগ নেতারা এগিয়ে এসেছিল বলে দাবি করা হয়। দুটি অভিযোগেরই তদন্তে সদর থানার এসআই আবুল কালামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ওসি আরও বলেন, ‘স্বাধীনের বিরুদ্ধে ফারজানা যেসব অভিযোগ করেছেন পুলিশি তদন্তে তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগ বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। অন্যদিকে স্বাধীনকে মারধরের প্রাথমিক সত্যতা মেলায় তার বাবার অভিযোগ মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অপরাধী যেই হোক, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’
ভুক্তভোগী শরিফুল ইসলাম স্বাধীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার দিন আমাকে মারধর করে আহত করার পর আমি পুলিশের কাছে অভিযুক্তদের নাম বলে দেওয়ায় তারা হাসপাতালে যাওয়ার পথেই আমাকে অসংখ্য মামলায় ফাঁসানো হবে বলে হুমকি দেয়। পরে জানতে পারি জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি তপু রায়হানের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ফারজানাকে দিয়ে উত্ত্যক্ত করা ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছে। আমি ফারজানাকে অসম্মানসূচক কিছুই বলিনি, কলেজের শিক্ষকরা তার সাক্ষী আছেন। আমাকে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতনের ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই একজন নারীকে জড়িয়ে জঘন্য মিথ্যাচার করেছে। আমি এ বিষয়েও আইনগত পদক্ষেপ নেব।’
উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছিলেন কি না সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজানা রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে তা বলতে বাধ্য নন বলে জানান। ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক সে বিষয়েও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সদর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ পুরো ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
উল্লেখ্য, স্বাধীনকে শ্রেণিকক্ষে ঢুকে তুলে নিয়ে পাশের কক্ষে মারধরের সময় বিভাগীয় প্রধান আলাউদ্দিন সরদার বিষয়টি তাৎক্ষণিক কলেজের অধ্যক্ষ বাহেজ উদ্দিনকে অবহিত করলে তিনি ঘটনাস্থলে আসেন। তবে তিনি স্বাধীনকে রক্ষায় কোনো উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো সন্ত্রাসীদের ক্যাম্পাসে কিছু না করে বাইরে নিয়ে পেটাতে বলেন।
