প্লেসমেন্ট শেয়ার কেলেঙ্কারিতে আলোচিত পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত রিংশাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কোনো টাকা জমা ছাড়াই নিজেদের নামে শেয়ার বরাদ্দ নিয়েছেন। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগে বিদেশি মালিকানাধীন এই কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের অন্তত ১৬ কোটি শেয়ার নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেন। এছাড়া আরও ৩৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে টাকা ছাড়াই রিংশাইনের প্লেসমেন্ট শেয়ার দিয়েছেন তারা।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) এক তদন্তে শেয়ার ছাড়া প্লেসমেন্ট শেয়ার বরাদ্দের এমন তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৮ সালে কোম্পানিটি প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পরিশোধিত মূলধন ৯ কোটি ৯৫ লাখ থেকে ২৮৫ কোটি ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করে। এই পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয়েছে কাগজে-কলমে। নগদ অর্থে প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর কথা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা হলেও কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি রিংশাইন কর্তৃপক্ষ। যদিও আইপিও প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্য সঠিক বলে স্বচ্ছতার সার্টিফিকেট দিয়েছিল কোম্পানির ইস্যু ম্যানেজার এএফসি ক্যাপিটাল ও সিএপিএম অ্যাডভাইজরি লিমিটেড। সবকিছু যাচাই করে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন দিয়েছিল মাহফেল হক অ্যান্ড কোং।
রিংশাইনের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ও পরবর্তীকালে কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে এসইসির দীর্ঘ তদন্তে প্লেসমেন্ট শেয়ার বরাদ্দসহ বেশকিছু বিষয়ে ব্যাপক অনিয়ম বেরিয়ে এসেছে। কোম্পানিটির ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের ৩০ পর্যন্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এসইসি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলছে, ওই সময়ের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনগুলোতে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতির বিষয়ে সত্য ও ন্যায্যতার প্রতিফলন ঘটেনি। প্লেসমেন্ট শেয়ার কেলেঙ্কারি, সিকিউরিটিজ ও এন্টি মানি লন্ডারিং আইন ভঙ্গসহ বিভিন্ন অনিয়মে যুক্তদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এসইসি। গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এমন ঘোষণা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
এসইসি জানিয়েছে, রিংশাইনের ১১ উদ্যোক্তা-পরিচালক কোনো টাকা জমা দেওয়া ছাড়াই ২০১৮ সালে বিপুল পরিমাণের শেয়ার প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বরাদ্দ নিয়েছেন। কোম্পানির প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সে সময় পরিচালক হিসেবে মোট ১২ জন ছিলেন, যাদের মধ্যে ৯ জন বিদেশি। অবশিষ্ট ৩ জন স্বতন্ত্র পরিচালক। বিদেশি পরিচালক হিসেবে ছিলেন, রিংশাইনে চুং জে মিন, হং সেই লাই, হিসাইও হাই হি, সুং ওয়েন লি এঞ্জেলা, সুং চুং ইয়াও, শিয়াও ইয়েন শিন, সুং ওয়ে মিন, হিসাও লিউ ই চাই ও চুক কুয়ান। এ ৯ উদ্যোক্তা-পরিচালক ২০১৮ সালে ১৩ কোটি ৪১ লাখ ৩৪ হাজার ২২০টি শেয়ার বরাদ্দ নিয়েছিলেন। এর বাইরে ওই বিদেশিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরও দুটি প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্স নিটিং গার্মেন্টস ও লার্ক টেক্সটাইলের নামে ৩ কোটিরও বেশি শেয়ার প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব শেয়ার কোনো টাকা ছাড়াই বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে।
অবশ্য টাকা ছাড়া ১১ উদ্যোক্তা-পরিচালক ও ৩৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ঠিক কত শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা এসইসি এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। কমিশন সূত্র জানিয়েছে, তালিকাভুক্তির পর বোনাস শেয়ার ইস্যু করা হয়েছে, যেগুলো ইতিমধ্যেই হাতবদল হয়ে গেছে। আবার অনেক প্লেসমেন্টধারী ১১৭ ফরমের মাধ্যমে শেয়ার হস্তান্তর করে দিয়েছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালক ছাড়া অন্য যাদের নামে প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করা হয়েছে, অধিকাংশ প্লেসমেন্টধারীর কোনো খোঁজ পায়নি এসইসির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের অধিকাংশই ভুয়া ঠিকানা ও ফোন নম্বর ব্যবহার করেছে।
এর আগে গত ২০ মে প্রাথমিকভাবে আইপিওর আগে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে উত্তোলিত মূলধনের বিপরীতে যেসব বিনিয়োগকারী টাকা দেয়নি সেসব শেয়ার এবং এগুলোর বিপরীতে ইস্যু করা বোনাস শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি এই অর্থ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে কমিশন। প্লেসমেন্টে অনিয়মের বিষয়টি চিহ্নিত হওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে রিংশাইনের প্রাইভেট প্লেসমেন্টের প্রায় ৪০ শতাংশ শেয়ার সিডিবিএলের মাধ্যমে ফ্রিজ করে রেখেছে কমিশন।
বস্ত্র খাতের কোম্পানি রিংশাইন ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে আইপিও প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। আইপিও প্রক্রিয়ায় কোম্পানিটি ১৫০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ছিল ৪৩৫ কোটি টাকা। তথ্য গোপন করে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানির নামে ইস্যু করা প্লেসমেন্ট শেয়ারে এর আগে তিন বছরের লকইন আরোপ করা হয়েছিল।
তালিকাভুক্তির দেড় মাসের মধ্যে রিংশাইন টেক্সটাইল কোম্পানির বিদেশি মালিকরা দেশ ছেড়ে চলে যান।
