বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

অন্যের আর্টিকেল প্রোফাইলে যোগ করে ‘শ্রেষ্ঠ গবেষক’!

আপডেট : ২৬ জুন ২০২১, ০২:১০ এএম

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অন্যের আর্টিকেল নিজের নামে চালানোর অভিযোগ উঠেছে। ওই শিক্ষককে ‘রেড লিস্ট’-এর অন্তর্ভুক্ত করেছে গবেষণাসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সাইট ‘গুগল স্কলার’। বেরোবি শিক্ষকের এই চৌর্যবৃত্তির ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ওই শিক্ষকের নাম রশিদুল ইসলাম। তিনি বেরোবির পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মুখতার ইলাহী হলের প্রভোস্ট।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, গবেষকরা গুগল স্কলারে নিজের নামে প্রোফাইল তৈরি করে নিজের আর্টিকেলগুলো সেখানে যোগ করে থাকেন। ড. রশিদুল ইসলাম বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেরিফাইড ই-মেইল আইডি দিয়ে তার নিজের নামে একটি প্রোফাইল তৈরি করেন গুগল স্কলারে। সেখানে তিনি বিভিন্ন দেশের গবেষকদের রচিত আর্টিকেল নিজের প্রোফাইলে যুক্ত করেন। ফলে তার প্রোফাইলের সাইটেশন (তথ্য স্বীকৃতি) বহুগুণে বেড়ে যায়। অন্যের আর্টিকেল নিজ প্রোফাইলে যুক্ত করায় শিক্ষক রশিদুলের সাইটেশন সংখ্যা হয়েছিল ৫২৯৬। তিনি এই সাইটেশনের ভিত্তিতে ‘ওয়ার্ল্ড সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং-২০২১’-এ বাংলাদেশের সেরা গবেষকদের একজন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষক নির্বাচিত হন। এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গবেষকের সাইটেশন সংখ্যা ১৪৫৯। পরে রশিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তালিকা থেকে তাকে সরিয়ে দিয়ে রেড লিস্টভুক্ত করে গুগল স্কলার। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে প্রথমে নিজের প্রোফাইল থেকে অন্যের লেখা আর্টিকেলগুলো সরিয়ে নেন রশিদুল। তখন তার প্রোফাইলে সাইটেশন সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৩। একপর্যায়ে গুগল স্কলার থেকে নিজের প্রোফাইলটিই মুছে (ডিলিট) ফেলেন এ বেরোবি শিক্ষক। তার জালিয়াতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সরব হয়েছেন। তাদের অনেকেই শিক্ষক রশিদুলের শাস্তি দাবি করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও গবেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রশিদুল ইসলাম অন্যের লেখা আটশোর বেশি পেপার নিজের গুগল স্কলার ডেটাবেজে যুক্ত করেছেন, যা মোটেই ঠিক নয়। গুগল স্কলারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রোফাইলে একই নামের লেখকের আর্টিকেল আসে, কিন্তু যতক্ষণ সিলেক্ট করা না হয় ততক্ষণ কোনো আর্টিকেলই নিজের প্রোফাইলে উঠে না। তিনি (রশিদুল) ইচ্ছাকৃতভাবেই এ কাজটি করেছেন, নতুবা র‌্যাংকিংয়ে তার নাম জনসমক্ষে আসার পরও কেন তিনি সরিয়ে ফেলেননি। এর মাধ্যমে তিনি চৌর্যবৃত্তি আইন ও ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অধীনে অপরাধ করেছেন। একজন শিক্ষকের নৈতিকতার স্খলনও হয়েছে।’

শিক্ষক রশিদুলের জালিয়াতির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেইসবুকে একজন গবেষক লিখেছেন, ‘...যত ধরনের প্রবন্ধ উনি নিজের নামে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তা উনার গবেষণার বিষয়ের সঙ্গে জড়িত নয়। তাছাড়া একজন গবেষকের এত পরিমাণ বৈচিত্র্যময় জ্ঞান থাকার কথা না। থাকতে পারে যদি সে হয় প্রডিজি (বিস্ময়কর কোনো ব্যক্তি বা বস্তু) অথবা চোর। উনার নামে কমপ্লেইন হওয়ার পরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উনাকে রেড লিস্ট করা হয়েছে।’

তবে স্বজ্ঞানে কোনো জালিয়াতি করেননি দাবি করে শিক্ষক রশিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘গুগল সাইটে অ্যাকাউন্ট খুলে ওইটাতে আমি আর ঢুকিনি। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আমার নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে এমন বেশকিছু আর্টিকেল অটোমেটিক ওইটাতে এসেছিল। প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে এমনটি হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পদোন্নতিসহ অ্যাকাডেমিক কোনো জায়গায় আমি এই আর্টিকেলগুলো নিজের বলে কখনো দাবি করিনি। এমনকি এর জন্য কোনো সুযোগও গ্রহণ করিনি। যা হয়েছে তা সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও অনিচ্ছাকৃত ভুল।’ ইতিমধ্যে গুগল স্কলার থেকে নিজের প্রোফাইলটিই মুছে ফেলেছেন বলেও জানান শিক্ষক রশিদুল।

শিক্ষক রশিদুলের বিরুদ্ধে ওঠা জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের পরিচালক ড. মো. তানজিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে এখনো অফিশিয়ালি কিছু জানি না। অফিশিয়ালি জানলে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত