মগবাজার বিস্ফোরণ: ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে ফের প্রাণহানির শঙ্কা!

আপডেট : ৩০ জুন ২০২১, ০২:৩৯ এএম

রাজধানীর মগবাজার ওয়ারলেস গেট এলাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়েছে। তিনতলা ওই ভবনটি পিলারের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভিমগুলো ভেঙে ঝুলে আছে। ফলে পুরো ভবনটি যেকোনো সময় ধসে পরতে পারে বলে মনে করছেন খোদ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। ভবনের সামনের মৌচাক- মগবাজার সড়কে গতকাল দিনভর ছিল তীব্র যানজট। ঝুঁকি নিয়েই এই সড়কে চলছেন পথচারীরা। এ অবস্থায় ভবনটি ধসে পরলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিস্ফোরণের দিনও সড়কটিতে যানজটের কারণে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

এদিকে বিস্ফোরণের পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনসহ ৬ টি ভবন বিদ্যুৎহীন রয়েছে। এর মধ্যে ৪ টি ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) কর্মীরা। গতকাল মঙ্গলবারও দিনভর বিদ্যুৎ লাইন মেরামতের কাজ করেছেন তারা। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির পেছনের সরু রাস্তা ভবনের ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাতায়াতের ব্যাঘাত ঘটছে স্থানীয়দের। ওই ভবনের আশপাশের দোকানি ও বাসিন্দারাও রয়েছেন চরম আতঙ্কে।

গতকাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভবন অপসারণ ও পথচারীদের নিরাপত্তায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ভবনটির ধ্বংস স্তূপের চারপাশ ফিতা টানিয়ে রেখেছে পুলিশ। তবে পুলিশের সদস্যদের শরীরেই কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেখা যায়নি। তারাও আতঙ্কে আছেন বলে জানান। প্রাথমিক ভাবে ভবনের ধ্বংসাবশেষ গুলোর মধ্যে কোনো লাশ আছে কিনা তা দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন অপসারণের কাজটি সিটি করপোরেশন ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) করবে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।

ভবনটি অপসারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রাজউক। কমিটি প্রতিবেদক জমা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান। 

উল্লেখ্য, গত রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বড় মগবাজার ওয়্যারলেস এলাকায় ৭৯ নম্বর রাখী ভিলায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। এতে গতকাল পর্যন্ত ৮ জনের প্রাণ হানির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় আহত হয়ে আরও অনেকে হাসপাতালে ভর্তি আছেন যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তায় থাকা অন্তত ১৫টি বাস, বেশ কিছু অটোরিকশা, প্রাইভেট কার ও অন্যান্য যানবাহন। আহতদের অধিকাংশই পথচারী।

গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত তিন তলা ভবনটির সামনে ও পেছনে দুই দিকেই সড়ক। বিস্ফোরণে ভবনের দেয়াল ও কাচের ভাঙা অংশগুলো স্তূপ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেই সড়ক দুটিতে। সার্বিক নিরাপত্তায় সেখানে রয়েছেন পুলিশ। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস কর্মীরাও সার্বক্ষণিক অবস্থান করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির প্রধান ফটকে সতর্কবার্তামূলক ব্যানার সাঁটিয়ে রেখেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সেখানে লেখা রয়েছে, ‘ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ, সর্বসাধারণের বসবাস ও প্রবেশ নিষেধ। নির্দেশক্রমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিস্ফোরণের পর থেকে ঘটনাস্থলের আশপাশের মোট ৬টি ভবন বিদ্যুৎহীন রয়েছে। এর মধ্যে চারটি আবাসিক ভবন রয়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত রবিবার রাত থেকে টানা বিদ্যুৎ না থাকায় এক দুর্বিষহ জীবন পার করছেন তারা। অনেকের বাসার ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিস্ফোরণের পর তারা এখনো রয়েছেন আতঙ্কে।

এদিকে ওই সকল ভবনে গতকালও দিনভর বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কাজ করেছে ডিপিডিসি কর্মীরা। গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে তাদের। বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করার কাজে নিয়োজিত ডিপিডিসি‘র লাইনম্যান মো. মুরাদ হোসেন গতকাল দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দুটি ভবন ছাড়া অন্যগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করার চেষ্টা করছি। আশা করছি রাতের মধ্যে সংযোগ চালু করতে পারব।’

ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ঘুরে দেখা গেছে, দ্বিতীয় তলায় ইলেকট্রনিক পণ্য সিঙ্গারের গোডাউনের মালামাল ছাদ ভেঙে ঝুলে আছে। পাশের দেওয়াল ভেঙে জানালা, এসি ও মালামাল ঝুলে আছে। যে কোনো সময় ভেঙে নিচে পরতে পারে। শর্মা হাউসের ভেতরের আসবাবপত্র ও জেনারেটর ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে সড়কের ফুটপাতে পরে আছে। শর্মা হাউসের পাশের দোকান ‘গ্র্যান্ড কনফেকশনারি’র সাটার খুলে রাস্তার পরে আছে। সর্বসাধারণের প্রবেশ ঠেকাতে ভবনটির চার পাশে ফিতা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে অবস্থান নিয়েছে পুলিশের সদস্যরা। তবে তারাও ঝুঁকিতে আছেন বলে জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরাও আতঙ্কের মধ্যে আছি। যে কোনো সময় আবার বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। তবে আমাদের ডিউটিতো পালন করতেই হবে।’

ঘটনার পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির সামনের সড়ক দিয়ে সার্বক্ষণিক চলছে যানবাহন। গতকাল বেলা ১টার দিকে ওই ভবনের সামনের সড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা যায়। ওই সব যানবাহনের বেশির ভাগই ছিল রিকশা। এসব রিকশার আরোহীরাও আতঙ্কে আছেন। আবু কালাম নামের এক পথচারী বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে ফার্মগেট যাচ্ছি। ঝুঁকি নিয়েই যেতে হচ্ছে।’ রিকশা আরোহী বিলকিস বেগম বলেন, ‘ভবনটি যেভাবে ঝুলে আছে তা দেখলেই ভয় লাগে। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে যেতে হচ্ছে। ভবনটি তাড়াতাড়ি সরিয়ে ফেলা উচিত।’

জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী। যে কোনো সময় ধসে পড়ার শতভাগ সম্ভাবনা রয়েছে। ভবনটি অপসারণের কাজ করবে সিটি করপোরেশন ও রাজউক। আমরা তাদের সঙ্গে থাকবো।’

কবে থেকে ভবন অপসারণের কাজ শুরু হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো এ বিষয়ে কোনো তথ্য আমাদের কাছে আসে নাই। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির পাশেই অবস্থান করছি।’

ভবনটি ধসে পরলে সড়কের পথচারীদের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই পথচারীদের প্রাণহানি ঘটতে পারে।’  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সন্ধ্যায় রাজউক চেয়ারম্যান এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর রাজউকের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কবে নাগাদ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি অপসারণের কাজ শুরু হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত