বাংলাদেশে প্রতি ১২ জন ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে একজনের বা ৮ শতাংশের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ দেখা গেছে। নারীদের পুরুষদের তুলনায় ডিমেনশিয়ার প্রকোপ আড়াই গুণ বেশি।ডিমেনশিয়ার প্রকোপ বেশি রাজশাহী ও রংপুরে, যথাক্রমে ১৫ ও ১২ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে শহুরে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে সমপরিমাণ ৮ শতাংশ হারে রোগী পাওয়া গেছে।
গত বুধবার আইসিডিডিআর,বি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের যৌথ সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়।
গবেষণার শিরোনাম ‘বাংলাদেশের প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ব্যাপকতা : জাতীয় সমীক্ষার ফলাফল। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং আইসিডিডিআর,বির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. তাহমিদ আহমেদ ও জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বিশেষ অতিথি ছিলেন। ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনসিডিসি প্রোগ্রামের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন।
ডিমেনশিয়া এমন একটি সিনড্রোম যে ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, আচরণ ও প্রতিদিনের ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করার ক্ষমতা কমে যায়। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ^ব্যাপী প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষের ডিমেনশিয়া রয়েছে এবং এর ৬০ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করে।
গত ২০০৯ সালে দেশের সাতটি বিভাগে আইসিডিডিআর,বি এবং জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল শহর ও গ্রামাঞ্চলের ২ হাজার ৭৯৬ জন ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে এই জরিপ চালায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমেনশিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যারা কখনো স্কুলে যায়নি এবং যাদের স্ত্রী বা স্বামী নেই সামগ্রিকভাবে ডিমেনশিয়ার প্রকোপ তাদের মধ্যে অন্যদের চেয়ে বেশি।
জরিপ অনুযায়ী, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অর্ধেকের বেশি হাইপারটেনশন (৫২%), হতাশা (৫৪%) এবং ডায়াবেটিসসহ (৮%) এক বা একাধিক দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা (মাল্টিমর্বিডিটি) ছিল।
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি পুষ্টির অভাব (৩৫% কম ওজন), স্বল্প শারীরিক ক্রিয়াকলাপ (৪৯%), উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণ (৫৬%) এবং উচ্চমাত্রায় তামাক সেবন (৭৬.৬%) করতে দেখা গেছে; যা সাধারণত নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা অসংক্রমিত রোগের ঝুঁকির কারণ।
জরিপে আরও পাওয়া গেছে, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের প্রায় সবারই (৯০%) গত ছয় মাসে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়েছে বলে জানা গেছে এবং তারা চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে (১২%) ও সরকারি হাসপাতালের (৫.৪ %) যোগ্য চিকিৎসকের চেয়ে কোনো ওষুধ বিক্রেতার কাছে (১৬.৬%) গিয়েছিলেন।
এই গবেষণার গুরুত্ব সম্পর্কে জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক এবং গবেষণার কো-পিআই অধ্যাপক ডা. কাজী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, সমাজের মধ্যে ডিমেনশিয়া সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তাই খুব দেরিতে রোগটি ধরা পড়ে।
অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, বিশেষত বহু রোগে আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিরা কভিড-১৯ মহামারীতে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন। তবুও আমাদের কাছে প্রবীণদের জন্য উপযুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে সামগ্রিক পরিষেবা মডেল নেই। তাই, সরকারী, বেসরকারী এবং গবেষণা সংস্থার প্রচেষ্টায় এই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য একটি সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আইসিডিডিআর,বির ইনিশিয়েটিভ ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ ইউনিটের প্রধান এবং গবেষণার প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ড. আলিয়া নাহিদ গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আমরাই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক প্রবীণ নাগরিকের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছি এবং ডিমেনশিয়ার প্রকোপ অনুমান করেছি। বার্ধক্য অনস্বীকার্য। এ জন্য বয়স্ক ব্যক্তির যতœকে কেন্দ্র করে সহানুভূতিশীল সহায়তাব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে যে ২০২০ সালে বাংলাদেশে মোট ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ১ মিলিয়ন। তাদের মধ্যে ০.২৮ মিলিয়ন পুরুষ এবং ০.৮৮ মিলিয়ন নারী। এই সংখ্যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়াবে ১.৩৭ মিলিয়নে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে এটি দ্বিগুণের বেশি হবে (২.৪ মিলিয়ন)। যদি উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে যে বয়স্ক ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বাংলাদেশের পরিবার, সমাজ, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি এ দেশে একটি উদ্ভাবনী স্থানীয় প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার প্রকোপ কমানো যাবে।
