ডিজিটাল মারপ্যাঁচ দরিদ্রদের ভাতার টাকা নয়ছয়!

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২১, ০১:৫৮ এএম

মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎপাত কমাতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী হতদরিদ্রদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার টাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা। সারা দেশের মতো ঢাকার কেরানীগঞ্জেও এসব ভাতার টাকা এমএফএসের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে গত মে মাস থেকে। তবে নানান জটিলতায় ভাতার টাকা সংগ্রহ করতে পারছেন না অনেকেই। ‘ডিজিটাল মারপ্যাঁচে’ ভাতার টাকা ওঠাতে জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ভুক্তভোগী অনেকেই গত কয়েক মাস ধরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও তুলতে পারছেন না ভাতার টাকা। এতে করে চরম বিপাকে পড়েছেন ভাতার টাকার ওপর নির্ভরশীল বয়োবৃদ্ধ শত শত নারী-পুরুষ।

কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাওলাদার রওশন আলী (৭৫)। তিন বছর ধরে নিয়মিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা পেয়ে আসছিলেন। তবে গত বছর নভেম্বর মাস থেকে ভাতার টাকা তুলতে পারছেন না তিনি। জটিলতা নিরসনে কেরানীগঞ্জ সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান মেলেনি। হাওলাদার রওশন আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করলে তারা বলছে, কোনো একটা নম্বরে ভুলের কারণে নাকি আমি এতদিন আমার টাকা পাইনি। এখন আর আমার টাকা দেওয়া হবে না। পরবর্তীকালে আবার বাজেট হলে নতুন করে দেওয়া হবে। আমার গেল ছয় মাসের টাকা আমি পেলাম না। অথচ এ টাকাটা দিয়ে আমি প্রতিমাসে ওষুধ কিনে খাই।’

আমবাগিচা খালপাড়ের বাসিন্দা মো. ইউনুস মিয়ার (৭৫) বয়স্ক ভাতার ছয় মাসের ৩ হাজার টাকা চলে গেছে জামালপুর জেলার এক ব্যক্তির কাছে। নিজের টাকা এতদূরের আরেকজনের নম্বরে কীভাবে গেল সেটা জানা নেই তার। আর যার নম্বরে টাকা গেছে তিনিও টাকা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন। এমন পরিস্থিতিতে কয়েকবার ইউনিয়ন পরিষদে দৌড়াদৌড়ি করলেও টাকার কোনো সুরাহা করতে পারেননি ইউনুস মিয়া। সমাজসেবা অফিস থেকে বলা হয়েছে, এ টাকার ব্যাপারে তাদের কিছুই করার নেই। তবে সুবিধাভোগীর তালিকা থেকে জামালপুরের ওই ব্যক্তির মোবাইল নম্বরটি কেটে ইউনুস মিয়ার নম্বর তুলে দিয়েছেন তারা। পরে আর সমস্যা হবে না এমনটা আশ্বাস দেওয়া হয়েছে তাকে।

একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়েছেন তেঘরিয়ার মনোরা বেগম। বিধবা ভাতার টাকা তুলতে না পেরে তিনি যোগাযোগ করেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, তার ভাতার ছয় মাসের ৩ হাজার টাকা চলে গেছে অন্য কোনো এক ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বরে। দুই মাস আগে এমএফএস সেবা ‘নগদ’-এর অ্যাকাউন্ট খোলার সময় যে মোবাইল ফোন নম্বরটি মনোরা দিয়েছিলেন, সে নম্বরে টাকা না এসে অন্য আরেকটি নম্বরে কীভাবে টাকা গেল সেটা জানেন না মনোরা। সমাজসেবা অফিস, তেঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ ও নগদ অফিস ঘুরেও এই ভুল নম্বরের কোনো ব্যাখ্যা পাননি তিনি। থানায় একটি জিডিও করেছেন এ বিষয়ে। কিন্তু শতচেষ্টা করেও টাকার কোনো সুরাহা করতে পারেননি।

শুভাঢ্যার সাফিয়া বেগম (৭৮) গত কয়েক দিন ধরে আসা-যাওয়া করছেন ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে। তিনিও গত ছয় মাস ধরে বয়স্ক ভাতার টাকা তুলতে পারছেন না। ভাতার টাকা তার মোবাইল ফোনের নগদ অ্যাকাউন্টে চলে এসেছে। কিন্তু এ টাকা কীভাবে তুলবেন সেটা জানা নেই সাফিয়ার। তিনি তার নগদ অ্যাকাউন্টের পিন নম্বরটি জানেন না। তার দাবি, সমাজসেবা কার্যালয়ের যে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে নগদ অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন তারা তাকে পিন নম্বরটি বলেননি। এখন তাকে রাজধানীর গুলিস্তানে নগদের কাস্টমার কেয়ারে যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু অসুস্থ সাফিয়া গুলিস্তানে কোথায় গিয়ে অফিস খুঁজবেন, কার কাছে যাবেন, কী করবেন তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।

কালন্দীর নুরু মিয়ার বয়স্ক ভাতার টাকাও চলে গেছে ভুল এক ব্যক্তির নগদ নম্বরে। সমাজসেবা কার্যালয় আর নগদ কার্যালয়ের লোকজন যখন তার মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করতে এসেছিলেন, তখন তিনি যে নম্বর দিয়েছিলেন সেটার সঙ্গে যে নম্বরে টাকা গেছে তার শেষের দুই ডিজিট ভুল হয়েছে। নুরু মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কয়েকবার আমার নম্বরটি তাদের বলেছি। পুনরায় চেক করতে বলেছি। তারা আমাকে আশ^স্ত করেছিলেন, নম্বর ঠিকঠাক দিয়েছেন। কিন্তু এখন টাকা আনতে গিয়ে দেখি নম্বর ভুল বসিয়েছে তারা। আর এর দায় তারা নিতেও চাচ্ছেন না। আমি কি আমার নিজের নম্বর ভুল বলব বলেন? যে নম্বরে টাকা গেছে ওই লোকও কল ধরছে না।’

কেরানীগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়নেই ভাতার টাকা উত্তোলনে এমন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন অনেকেই। প্রতিদিনই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে ভিড় করছেন ভাতার টাকা না তুলতে পারা লোকজন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের নগদ পিন নম্বরটি জানেন না। কারো কারো মোবাইল নম্বর ভুল ওঠানো হয়েছে। কারো কারো আবার দুই-একটি ডিজিট ভুল উঠেছে। আবার কারো ভাতার টাকা অন্য অপরিচিত ব্যক্তির নম্বরে চলে গেছে। টাকা অন্য ভুল নম্বরে চলে যাওয়ায় গত ছয় মাসের ভাতাবঞ্চিত ভাতাভোগীদের বড় একটি অংশ। আর এ ভুলের দায় সমাজসেবা কার্যালয় বা স্থানীয় নগদ কর্র্তৃপক্ষ কেউই নিতে চাইছে না। তারা একে অন্যকে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করছে।

ভুক্তভোগী কেউ কেউ বলছেন, আগে ভাতার টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হতো, সেটাই ভালো ছিল। এখন ডিজিটাল করাতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি হয়েছে। বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা যারা নেন, তাদের অনেকেরই মোবাইল ফোন নেই, নেই নগদ অ্যাকাউন্ট। টাকা সংগ্রহের জন্য তাদের তৃতীয়পক্ষের আশ্রয় নিতে হয়, এটা একটা অসুবিধা। অনেকেই নগদের পিন নম্বর কী সেটা জানেন না। এটা একটা সমস্যা।

ভুক্তভোগীরা আরও বলছেন, যারা ভাতার সুবিধাভোগকারীদের অ্যাকাউন্টগুলো খুলে দিয়েছেন, তারা কাজের সময় খামখেয়ালি করেছেন। মনোযোগ দিয়ে কাজ করেননি বলেই নম্বরগুলো উল্টাপাল্টা হয়েছে। দুই-একটা ভুল হয়তো মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু অধিকাংশ নম্বরেই ভুল এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর। এ ক্ষেত্রে ভাতার টাকা নয়-ছয়ের জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল করা হয়েছে কি না তা যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

পরস্পরকে দোষারোপ নগদ ও সমাজসেবা কর্র্তৃপক্ষের : ভাতার টাকা উত্তোলনে জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে এমএফএস সেবা নগদের কেরানীগঞ্জের পার্টনার রিলেশনশিপ অফিসার (পিআরও) সৈয়দ গোলাম মোর্শেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্পূর্ণ নম্বর ভুল অথবা ডিজিট ভুল যাই হোক না কেন, এর দায় স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের লোকজনের। এখানে নগদের বা নগদের কর্মকর্তাদের বিন্দুমাত্র ভুল নেই। তারা আমাদের যে নম্বরগুলো দিয়েছে, আমরা ওই নম্বরের নগদ অ্যাকাউন্ট আপডেট করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ২০ জন স্টাফ দুই মাস পরিশ্রম করে কেরানীগঞ্জে ২৭ হাজার ভাতা সুবিধাভোগীর মধ্যে ২০ হাজার সুবিধাভোগীর নগদ সিস্টেম চালু করে দিয়েছে। সমাজসেবার লোকজন যেভাবে চেয়েছে, আমরা ওইভাবেই কাজ করেছি। তবে বাকি সাত হাজার লোকের ইনফরমেশন সমাজসেবার লোকজন সংগ্রহ করেছে। আমাদের ২০ হাজার লোকের কাজটা করতে সময় লেগেছে দুই মাস। আর তারা কয়েকজন মিলে বাকি সাত হাজার লোকের তথ্য চার-পাঁচ দিনে কীভাবে আপডেট করল তা আমাদের জানা নেই।’

অন্যদিকে ভাতাভোগীদের টাকা উত্তোলনে জটিলতার দায় নগদ কর্র্তৃপক্ষের বলে দাবি করেছেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ফখরুল আশরাফ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নম্বর ভুলের দায় সম্পূর্ণ নগদ কর্র্তৃপক্ষের। মাঠপর্যায়ে তাদের যে দায়িত্বটি দেওয়া হয়েছিল তা তারা ঠিকমতো পালন করেনি। তারা ঠিকমতো কাজ করেনি বিধায় আজকে এত সমস্যা। তাছাড়া তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করতে অদক্ষ লোক দিয়েছিল। তাদের অদক্ষতার কারণেই এত ভুল হয়েছে। আর তারা ২২ হাজার লোকের তথ্য দুই মাসে আপডেট করেছে। বাকিগুলো সমাজসেবা অফিসের লোকজন ২৫ দিন সময় নিয়ে করেছে। ভুলের বিষয়ে সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব নগদ কর্র্তৃপক্ষের।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন কয়েকটা অভিযোগ আমিও পেয়েছি। ভুলটা কোথায় হচ্ছে তা খুঁজে বের করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর যে উদ্যোগ তা নস্যাৎ করতে যদি কোনো চক্র কাজ করে থাকে তাহলে তাদের প্রতিহত করতে আইনি পদক্ষেপসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তার আগে আমাদের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। টেকনিক্যাল কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা সমাধান করার চেষ্টা করা হবে। আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করলে তার বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত