কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২১, ০১:০৩ এএম

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে আল্লাহতায়ালা সারা বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফজিলতপূর্ণ ইবাদতের সমাহার ঘটিয়েছেন, যা অন্য কোনো মৌসুমে নেই। নামাজ, রোজা, হজ, কোরবানি ও সদকার মতো আমল এ মৌসুমের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে। কোরআনে কারিম ও হাদিসে রাসুলে এই দিনগুলোর বিষয়ে আলাদা আলাদা বর্ণনা রয়েছে। এক হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এই দিনগুলোর তুলনায় এমন কোনো দিন নেই যাতে কোনো সৎ আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’ অর্থাৎ জিলহজের প্রথম দশ দিন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘জিলহজের প্রথম দশ দিনের সৎ আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে উত্তম ও অধিক সওয়াবের আর কোনো আমল নেই। লোকেরা বলল, আল্লাহর পথে জেহাদও নয় কি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জেহাদও নয়, তবে কোনো ব্যক্তি যদি তার জানমালসহ জেহাদ করতে বের হয়ে যায় এবং এর কোনো কিছুই নিয়ে আর ফিরে না আসে (শহীদ হলে ভিন্ন কথা)।’আবু দাউদ

ফরজ ও ওয়াজিব আমলসমূহ সবচেয়ে বড় নেকির কাজ। এগুলো উত্তম ইবাদত ও আবশ্যকীয় আমল। আর সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইসলামের রোকন ও মৌলিক বিধান তথা ইমান, নামাজ, জাকাত, হজ ও রোজা। এই ইবাদতগুলোকে ইসলামের প্রবেশদ্বার ও মৌলিক বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ ভিত্তিগুলোর ওপর দ্বীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। এগুলো মানুষের ওপর প্রথম আবশ্যকীয় ও ফরজ বিষয়, যা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। কেয়ামতের দিন এসব আমলেরই সর্বপ্রথম হিসাব নেওয়া হবে। বান্দার সওয়াব ও শাস্তি এগুলোর ওপর নির্ভর করে। পরকালে নাজাত ও সফলতা এসব ইবাদতের মধ্যে নিহিত। মানুষের ক্ষতি ও ধ্বংস এর কারণেই হবে। যে ব্যক্তি এই মৌলিক বিষয়গুলো আঁকড়ে থাকবে এবং তা যত্নসহকারে পালন করবে, সে ব্যক্তি কল্যাণময় সুদৃঢ় রশি ধারণ করল। আর যে ব্যক্তি তা বিনাশ করবে, সে মূলত নিজের ওপর জুলুম করল এবং নিজের কর্ম ও জীবনকে বিফল করল; এমন ব্যক্তি পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

হজ ইসলামের একটি অন্যতম রোকন, যা আল্লাহতায়ালা সামর্থ্যবানদের ওপর ফরজ করেছেন। এ মর্মে তিনি বলেছেন, ‘আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।’সুরা আলে ইমরান : ৯৭

আল্লাহতায়ালা মুমিনদের হৃদয়ে বায়তুল হারামের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে দিয়েছেন। যেহেতু প্রতি বছর হজ করতে যাওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়, তাই যার সাধ্য রয়েছে তার ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ করে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা হজকে ব্যক্তির সামর্থ্যরে সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।’সুরা আলে ইমরান : ৯৭

সামর্থ্যরে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, সুস্থতা, নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত পাথেয় ও যাওয়ার মাধ্যম। কাজেই যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে এবং সে তা আদায়ার্থে সাড়া দিয়েছে, কিন্তু শরিয়ত অনুমোদিত কোনো সমস্যা তাকে আটকে দিয়েছে; তাহলে সে সওয়াব পেয়ে যাবে। তাকে সাধ্যের বাইরে কিছু করতে হবে না। বরং আশা করা যায়, তার নিয়ত সঠিক থাকলে আল্লাহর ইচ্ছায় অদূর ভবিষ্যতে তার জন্য তা সহজ হয়ে যাবে।

সৎ কাজ ভুলত্রুটি ও অসৎ কাজকে মিটিয়ে দেয়। হজ হচ্ছে অন্যতম গোনাহ মোচনকারী সৎ কাজ। হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ একটার পর আরেকটা আদায় করো। কেননা এ দুটি আমল দরিদ্রতা ও গোনাহ মিটিয়ে দেয়, যেমন হাপর লোহা, সোনা ও রুপার মরিচা দূর করে। আর কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’তিরমিজি

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করল এবং অশালীন কথাবার্তা ও ফাসেকি কাজ করল না, সে ওই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এলো যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’সহিহ বোখারি

হজ ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। এ নামেই আল্লাহতায়ালা সুরা হজ নাজিল করেছেন এবং তাতে অসংখ্য আয়াত ও নিদর্শনাবলি অবতীর্ণ করেছেন। অতএব হে হজ সম্পাদনকারীরা! আপনাদের অভিনন্দন; আল্লাহতায়ালা আপনাদের তার বিশেষ ফরজ ইবাদত পালনের সুযোগ দিয়েছেন ও তার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার তওফিক দিয়েছেন। এটা মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়া। অতএব এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইবাদতে মনোনিবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে পরকালের পাথেয় সঞ্চয়ে সময় ব্যয় করতে হবে এটাই সর্বোত্তম সুযোগ ও সময়।

মহান আল্লাহ সবার হজকে সহজ করে দিন। এবার অনেকের জন্য হজের সুযোগ আসেনি, এমতাবস্থায় আল্লাহতায়ালা যাদের হজ পালনের জন্য মনোনীত করেছেন, তাদের উচিত এজন্য কৃতজ্ঞতা আদায় করা ও সুযোগটি কাজে লাগানো।

হজ পালনকারীরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভূখণ্ড বায়তুল্লাহিল হারামে হজের কার্যাদি সম্পাদনের জন্য আগমন করবেন। এ স্থানের মর্যাদার কথা মনে রেখে ইবাদতে মনোনিবেশ করতে হবে। কারণ, হজযাত্রীরা এমন এক ইবাদতের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা দ্বারা যাবতীয় পাপ-পঙ্কিলতার বোঝা নামিয়ে ফেলা হয়, ভুলত্রুটি মাফ করা হয়, সম্মান বৃদ্ধি করা হয় এবং দোয়া কবুল করা হয়। যখন হজ পালনকারীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করবেন, তখন আল্লাহতায়ালা তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলবেন, ‘দেখো, আমার বান্দারা দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে এলোমেলো চুলে ও ধুলোমলিন হয়ে আমার কাছে এসেছে। আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, নিশ্চয় আমি তাদের ক্ষমা দিলাম।’

সুতরাং হজের দিনগুলোতে ইবাদত পালনে পূর্ণ মনোযোগী থাকতে হবে। অহেতুক কথা ও কাজে সময় নষ্ট করা যাবে না। কারও সঙ্গে অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ করা যাবে না। প্রত্যেক আমলের ক্ষেত্রে নিয়ত বিশুদ্ধ রাখার পাশাপাশি সুন্নত পালন এবং বিদআত বর্জনের চেষ্টা করতে হবে। হজ পালনকালে শৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের দেওয়া নিয়ম ও নির্দেশনাগুলোও মেনে চলতে হবে। এর ফলে সেবা প্রদান ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়। আল্লাহতায়ালা সবার হজ ও যাবতীয় ইবাদতকে কবুল করুন।

১৬ জুলাই মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। বঙ্গানুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত