ঈদুল আজহা সামনে রেখে কাঁচা চামড়া কিনতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছেন চট্টগ্রামের আড়তদাররা। মজুদ করা হয়েছে লবণ। বুকিং দিয়ে রাখা হয়েছে শ্রমিক। করোনার কারণে চলতি বছর কোরবানি কম হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সাড়ে তিন লাখ কাঁচা চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশন থেকে ইতিমধ্যে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এরপরই চামড়া কেনার প্রস্তুতি শেষ করেছেন চট্টগ্রাম নগর ও জেলার প্রায় তিন শতাধিক আড়তদার। চামড়া কিনতে আগ্রহী ট্যানারির মালিকদের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা চলছে। নগরীর আতুরার ডিপো এলাকার একাধিক আড়তদার জানান, কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের একমাত্র কাঁচামাল লবণ। তাই বিভিন্ন গুদামে ইতিমধ্যে লবণ কিনে রেখেছেন আড়তদাররা। চামড়া সংগ্রহের পর তা সংরক্ষণের জন্য কয়েক দিন লবণ মেখে রাখতে হয়। পরে লবণ ছাড়িয়ে শুকানো হয়। ঈদের সপ্তাহখানেক পরে ট্যানারির মালিকরা এসব চামড়া কিনতে আসেন। আড়তদাররা জানান, গত বছর চট্টগ্রাম থেকে প্রায় চার লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ হয়েছিল। পরে ট্যানারির মালিকরা এসব চামড়া কিনে নিয়ে যান। আগে চামড়ার বকেয়া টাকা নিয়ে ট্যানারির মালিকদের বিরুদ্ধে গড়িমসির অভিযোগ থাকলেও এখন তা নেই বলেও জানান তারা।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়ার আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনের কারণে চলতি বছর গতবারের চেয়ে পশু কোরবানি কম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাই এবার গরু ও ছাগল মিলে সাড়ে তিন লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে আমাদের। তবে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে শহরের আড়তগুলোয় চামড়া আনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধার্থে ঈদ-পরবর্তী কয়েক দিন লকডাউন শিথিল থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, কোরবানির আগে সরকার চামড়ার দর নির্ধারণ করে দিলেও অতীতে দেখা গেছে, ট্যানারির মালিকরা দাম কম দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। মুসলিম উদ্দিন বলেন, একটি চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে লবণের দাম, শ্রমিকের মজুরি ও গুদাম ভাড়াÑ সব মিলিয়ে ১৭০-১৮০ টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট ধরে নেওয়া হয়। যথাযথ দাম না পেলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই ট্যানারির মালিকরা যাতে নির্ধারিত দামে চামড়া কেনেন, তা নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং প্রয়োজন। আড়তদাররা জানান, একসময় চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি থাকলেও একে একে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় সবগুলো। এখন রিফ লেদার নামে একটি ট্যানারি রয়েছে। তাদের চামড়া ক্রয়ের সক্ষমতা সীমিত। এতে প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে সংগৃহীত চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় আড়তদারদের। চামড়া বিক্রির জন্য পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয় ঢাকার ট্যানারির মালিকদের ওপর। তাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে চামড়ার দাম পাওয়া না পাওয়া। তবে এবার ৫টি প্রতিষ্ঠানকে ‘ওয়েট ব্লু’ চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই এ বছর চামড়ার চাহিদা থাকবে বলে মনে করছেন তারা।
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁচা চামড়া নিয়ে আড়তদাররা ট্যানারির মালিকদের কাছে জিম্মি। একইভাবে সাধারণ মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও আড়তদারদের কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েন। ভালো দাম পাওয়ার আশায় জেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলো থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে আড়তে নিয়ে গেলে তারা কম দাম দিয়ে ঠকানোর চেষ্টা করেন।
২০১৯ সালে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে না পেরে চট্টগ্রাম নগরীতে প্রায় এক লাখ পিস চামড়া রাস্তায় ফেলে দিতে হয়েছিল মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। শেষ পর্যন্ত এসব চামড়ার স্থান হয়েছিল নগরীর বায়েজীদে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভাগাড়ে।
কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি বলেন, আসলে সরকার লবণ মাখানো চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। এর মধ্যে চামড়ার দাম, লবণ ও শ্রমিকের মজুরি হিসাব করতে হবে। এ ছাড়া ট্যানারির মালিকরা আড়তদারদের কাছ থেকে কেনার সময় মোট চামড়ার ওপর ১০-১৫ শতাংশ বাদ দেন। সেটাও হিসাবে আনতে হবে। এভাবে হিসাব করলে কাঁচা চামড়ার দাম হবে সরকার নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক। কিন্তু সেটা না বুঝে অনেকেই বেশি দামে চামড়া কিনে লোকসানে পড়েন। এ ছাড়া ওই সময় নগদ অর্থসংকটও ছিল। তবে এবার রাস্তায় চামড়া ফেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি হওয়ার আশঙ্কা নেই জানিয়ে কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি জানান, এখন সবাই সচেতন। তখনকার মতো অর্থসংকটও নেই।
চলতি বছর লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা ও ঢাকার বাইরে ৩৭ টাকা। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া ১৫-১৭ ও বকরির চামড়া ১২-১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
