ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় প্রয়োজন। ইবাদতটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরিয়তের নির্দেশনা মোতাবেক বিধি-বিধান অনুযায়ী সম্পাদন করা। এ উদ্দেশ্যে কোরবানির কিছু জরুরি মাসয়ালা উল্লেখ হলো
সাত শরিকের কোরবানি : একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কোরবানি দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কোরবানি করলে সহিহ্ হবে না। আর উট, গরু, মহিষ সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারবে। সাতের অধিক শরিক হলে কারও কোরবানি সহিহ্ হবে না। সহিহ্ মুসলিম : ১৩১৮
সাতজন মিলে কোরবানি করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারও আধা ভাগ, কারও দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরিকের কোরবানি শুদ্ধ হবে না। বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২০৭
উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কোরবানি করা জায়েজ। সহিহ্ মুসলিম : ১৩১৮
কোরবানির গোশত জমিয়ে রাখা : কোরবানির গোশত তিনদিনেরও অধিক সময় জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েজ। মুয়াত্তা মালেক : ১/৩১৮
কোরবানির গোশত বণ্টন : শরিকে কোরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েজ নয়। আদ দুররুল মুখতার : ৬/৩১৭
মাসয়ালা : কোরবানির গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরিব মিসকিনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয় স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। তদ্রুপ পুরোটা দান করে দিলেও সমস্যা নেই। বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৪
কোনো অংশীদারের নিয়তে গলদ থাকলে : কেউ আল্লাহর হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানি না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করলে তার কোরবানি শুদ্ধ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে অন্য শরিকদের কোরবানি হবে না। তাই সতর্কতার সঙ্গে শরিক নির্বাচন করতে হবে। শরিকদের কারও পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারও কোরবানি সহিহ্ হবে না বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২০৮
মাসয়ালা : যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কোরবানি দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা করলে অন্যকে শরিক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একা কোরবানি করাই শ্রেয়। শরিক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরিব হয়, যার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে শরিক করতে পারবে না। এমন গরিব ব্যক্তি যদি কাউকে শরিক করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিতে হবে। কাজিখান : ৩/৩৫০-৩৫১
মুসাফিরের কোরবানি : যে ব্যক্তি কোরবানির দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগকারী) তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯৫
দরিদ্র ব্যক্তির কোরবানির হুকুম : দরিদ্র ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু কেনে তাহলে তা কোরবানি করা ওয়াজিব। বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯২
জবাইকারীকে চামড়া ও গোশত দেওয়া : জবাইকারী, কসাই কিংবা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসেবে গোশত বা তরকারি দেওয়া যাবে।
জবাইয়ের অস্ত্র : ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম। জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্যকোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। তদ্রƒপ এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই না করা ভাল। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না দেওয়া যাবে না। বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৩
কোরবানির গোশত বিধর্মীকে দেওয়া : কোরবানির গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েজ। ইলাউস সুনান : ৭/২৮৩
নিজের কোরবানির গোশত খাওয়া : কোরবানিদাতার জন্য নিজ কোরবানির গোশত খাওয়া মুস্তাহাব। সুরা হজ : ২৮
ঋণ করে কোরবানি : কোরবানি ওয়াজিব এমন ব্যক্তির ঋণের টাকা দিয়ে কোরবানি করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের ওপর ঋণ নিয়ে কোরবানি করা যাবে না।
নবী কারিম (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোরবানি : সামর্থ্যবানদের জন্য হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে কোরবানি করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারিম (সা.) হজরত আলী (রা.) কে তার পক্ষ থেকে কোরবানি করার অসিয়ত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোরবানি দিতেন। আবু দাউদ : ২/২৯
কোরবানি করতে না পারলে : কেউ যদি কোরবানির দিনগুলোতে ওয়াজিব কোরবানি দিতে না পারে তাহলে কোরবানির পশু ক্রয় না করে থাকলে তার ওপর কোরবানির উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কোরবানি দেওয়া হয়নি তাহলে ওই পশু জীবিত সদকা করে দেবে। কাজিখান : ৩/৩৪৫
কোরবানির গোশত দিয়ে খানা শুরু করা : ঈদুল আজহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কোরবানির গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কোরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ জিলহজের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। আল বাহরুর রায়েক : ২/১৬৩
প্রথম দিন কখন থেকে কোরবানি করা যাবে : যেসব এলাকার লোকদের ওপর জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা জায়েজ নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্যকোনো সমস্যার কারণে যদি প্রথম দিন ঈদের নামাজ না হয় তাহলে ঈদের নামাজের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কোরবানি করা জায়েজ। আদ দুররুল মুখতার : ৬/৩১৮
রাতে কোরবানি করা : ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কোরবানি করা জায়েজ। তবে রাতে আলো স্বল্পতার দরুন জবাইয়ে ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা অনুত্তম। অবশ্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতে জবাই করতে কোনো অসুবিধা নেই। ফাতাওয়া খানিয়া : ৩/৩৪৫
কোরবানির উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর জবাই করলে : কোরবানির দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তাও সদকা করতে হবে। আদ দুররুল মুখতার : ৬/৩২০-৩২১
