বিএনপির ঢাকা মহানগর

নতুন কমিটিতে সংস্কারপন্থি দলে সমালোচনার ঝড়

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২১, ০২:১৫ এএম

ঢাকা মহানগর বিএনপির দুই ইউনিটের নতুন কমিটি ঘোষণার পর দলের মধ্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কমিটিতে সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতা ও একজন গোলকিপার থাকায় সমালোচনা করে দলের অনেক সিনিয়র নেতা বলেছেন, এই কমিটি আন্দোলন ঝিমিয়ে দিতে পারে। তবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে জোরদার ভূমিকা রাখবে নতুন এই কমিটি।

গতকাল মঙ্গলবার নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওয়ান-ইলেভেনে যেসব সংস্কারপন্থি নেতা দলের বিরুদ্ধে গিয়ে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করেছিলেন তাদেরকেই সদ্য ঘোষিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়কসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া একজন গোলকিপারকে ঢাকা মহানগরীর উত্তরের সদস্য সচিব করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো খেলার মাঠে আর রাজনীতি এক নয়। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যর্থ বিএনপি মহানগরের নতুন কমিটিতে একজন গোলকিপারকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে। এখন গোলকিপার নয়, দরকার স্ট্রাইকার। এখন গোল ঠেকাতে হবে না বরং গোল দিতে হবে।’

দলের একজন যুগ্ম মহাসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীর রাজনীতি চ্যালেঞ্জিং ইউনিট। এখানে নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা নয়। ঢাকার বাসিন্দা ও মহানগরে পরিচিত মুখদের দিয়ে কমিটি ঘোষণা করা হলে ভালো হতো। এ দুই ইউনিট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ঠিক হয়নি। এর আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাতে লাভ হয়নি। এরপর ঢাকাকে ভেঙে উত্তর ও দক্ষিণ দুই ইউনিট করে কমিটি ঘোষণা করা হয়। তাতেও কোনো লাভ হয়নি।’

এদিকে সদ্য ঘোষিত ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নতুন কমিটির নেতারা কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন। গত সোমবার বিকেলে এই দুই ইউনিটের কমিটি ঘোষণার পর দুই ইউনিটের নেতারা গতকাল মঙ্গলবার সকালে উত্তরায় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাসায় বৈঠক করেন।

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘কমিটি আগামী দিনে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে জোরদার ভূমিকা রাখবে।’

নতুন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নবগঠিত কমিটি আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির প্রতি সারা দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। এরা সবাই পরীক্ষিত নেতৃবৃন্দ। আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক যে প্রেক্ষাপট সেই প্রেক্ষাপটে এটা (নতুন কমিটি গঠন) নিঃসন্দেহে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে, এই কমিটির মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতির একটা গুণগত পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে যে অগণতান্ত্রিক একটি সরকার আমাদের সব আশা-আকাক্সক্ষা বিনষ্ট করে দিচ্ছে সেখানে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন, ভূমিকা রাখবেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের সবার যে প্রত্যাশা সেই প্রত্যাশা হচ্ছে যে, অত্যন্ত সক্রিয়, সচল এবং কার্যকরী এই আহ্বায়ক কমিটি তারা অতিদ্রুত দলকে সুসংগঠিত করবে এবং একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন করবে।’

কবে নাগাদ মহানগরের কাউন্সিল হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তো আমাদের যে গঠনতন্ত্র আছে সেই গঠনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী কাউন্সিল করবে। সেটা তিন মাস।’

বর্তমান কমিটি নিয়ে ক্ষোভ আছে যে মূল্যায়ন করা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বিএনপি একটা বিশাল রাজনৈতিক দল। সেই দলের যখন একটি কমিটি তৈরি করা হয় তখন ছোটখাটো সমস্যা থাকতেই পারে। আমরা যেটা দেখছি যে, একেবারে পরীক্ষিত নেতাদের দিয়েই এই কমিটি করা হয়েছে। প্রবীণ এবং নবীনের সমন্বয় করা হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে একটা কার্যকরী কমিটি হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’

পরে কমিটির নেতারা নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান। সেখানে তাদের শুভেচ্ছা জানান দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। বিকেলে প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুপুরের দিকে মহানগরীর নতুন কমিটির নেতারা কার্যালয়ে এসেছিলেন। তারা কিছু সময় নিজেরা বৈঠক করেন। নেতাকর্মীরা তাদেরকে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

গত সোমবার ঢাকা মহানগরের নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। নতুন কমিটিতে দক্ষিণে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালামকে আহ্বায়ক ও মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সভাপতি রফিকুল আলম মজনুকে সদস্য সচিব করে ৪৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করা হয়েছে। উত্তরে ৪৭ সদস্যের কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আমান উল্লাহ আমানকে এবং সদস্য সচিব হয়েছেন সাবেক ফুটবলার কেন্দ্রীয় কমিটির ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক।

মহানগর উত্তরের নতুন আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান এ সময় বলেন, ‘আজকে গণতন্ত্র অনুপস্থিত, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চলছে। নির্যাতন-নিপীড়ন ও অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। সেজন্য সংগঠনকে ঢেলে সাজিয়ে জনগণের যে প্রত্যাশা জনগণ যাতে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে পারে, একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে যাতে নির্বাচন হতে পারে, সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যাতে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হয়, সেই লক্ষ্যকে সফল করার জন্য আমরা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ একসঙ্গে একযোগে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কাজ করব। যদি প্রয়োজন হয় ১৯৯০ সালের মতো আরেক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই নব্য স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক, অবৈধ, মিডনাইটের সরকারকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরানোর আন্দোলন-সংগ্রাম করব।’

মহানগর দক্ষিণের নতুন আহ্বায়ক আবদুস সালাম বলেন, ‘চেষ্টা করব আমরা যাতে এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে। সে ব্যাপারে মহাসচিব থেকে শুরু করে মহানগরসহ দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর সহযোগিতা চাই। আমরা উত্তর-দক্ষিণ মহানগর একসঙ্গে মিলেই সমবেতভাবে মহানগরীতে কাজ করার চেষ্টা করব, যাতে কোথাও কোনো গ্যাপ সৃষ্টি না হয়, কোনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়। সবাইকে নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত