আফগানিস্তান থেকে পালাতে উন্মুখ যুক্তরাষ্ট্রের অনুসারীদের সাময়িক আশ্রয়ের জন্য ওয়াশিংটনের অনুরোধ ঢাকা নাকচ করে দিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে ‘কষ্টে’ থাকায় সরকার এমন অবস্থান নিয়েছে বলে গতকাল সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন জানিয়েছেন। এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তালেবান সরকার যদি জনগণের সরকার হয় তবে তাদের জন্য ঢাকার দরজা খোলা থাকবে। তারও আগে মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি খুব সাবধানতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। স্থায়ীভাবে তালেবান সরকার গঠনের পরই ঢাকা তার অবস্থান জানাবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তানের সরকারের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। তারা সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে এটাই প্রত্যাশা। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ দেশটির সঙ্গে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে। এখন পর্যবেক্ষণ করাই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিবৃতিতে আফগানিস্তানে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে আফগানিস্তানের চলমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে বলা হয়, বাংলাদেশ সাবধানে আফগানিস্তানের দ্রুত বিকশিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। আমাদের বিশ্বাস এর প্রভাব এই অঞ্চলে এবং এর বাইরেও হতে পারে। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে, একটি গণতান্ত্রিক এবং বহুত্ববাদী আফগানিস্তান তার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত দেশটির স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের একমাত্র নিশ্চয়তা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজেকে সম্ভাব্য উন্নয়ন সহযোগী এবং আফগানিস্তানের বন্ধু মনে করে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে ভাগ করে নেয়। এটি সার্কের সহকর্মী সদস্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আফগানিস্তানের সরকার ও জনগণের সহায়তা বাংলাদেশ স্মরণ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নীতি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ আফগানিস্তানের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা টেকসই উন্নয়নে এ অঞ্চলকে একসঙ্গে সমৃদ্ধ করতে পারে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, আফগানিস্তানের জনগণের ওপর তাদের দেশ পুনর্নির্মাণ এবং ভবিষ্যতের গতিপথ নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য আফগানিস্তানের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে পেরে বাংলাদেশ খুশি হবে। আমরা মৌলিক শিক্ষা, কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আইসিটি সক্ষম পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি প্রভৃতি ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ ভাগ করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। বেসরকারি সংস্থা-এনজিও যারা গত ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে কাজ করছে তারা সেই দক্ষতা প্রদর্শনও করেছে।
এদিকে গতকাল রাতে কিছু আফগানকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছিল জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বন্ধু দেশ, তারা আমাদের কাছে অনুরোধ করেছিল, আমরা না করেছি। আমরা বলেছি, রোহিঙ্গাদের নিয়ে অনেক কষ্টের মধ্যে আছি, আমাদের আর ঝামেলার ফেলবেন না।’
তিনি বলেন, ‘প্রথমে ওয়াশিংটনে আমাদের রাষ্ট্রদূতের কাছে এবং পরে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিছু আফগান নাগরিককে সাময়িকভাবে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার অনুরোধ জানায়। যুক্তরাষ্ট্র এ সময় জানায়, তারা বাংলাদেশসহ কিছু বন্ধু দেশকে এ অনুরোধ জানিয়েছে। এরপর আমরা জানতে চেয়েছিলাম কোন কোন দেশকে তারা এ অনুরোধ জানিয়েছে। আফগানিস্তানের কী পরিমাণ নাগরিককে কত দিনের জন্য রাখতে হবে। এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।’
এর আগে বিকেলে রাজধানীর বিসিপিএস মিলনায়তনে সিনোফার্ম টিকার যৌথ উৎপাদনে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি শেষে তালেবান সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে কি নাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন বলেন, ‘তালেবান সরকার যদি হয় কিংবা হয়েছে এবং সেটা জনগণের সরকার হলে আমাদের দরজা অবশ্যই খোলা থাকবে।’
তিনি বলেন, আমরা জনতার সরকারে বিশ্বাস করি। জনগণ যাকে পছন্দ করে আমরা সেই সরকারে বিশ্বাস করি। আমরা গণতান্ত্রিক সরকারে বিশ্বাসী। সে দেশের মানুষের ইচ্ছায় তৈরি করা সরকারে বিশ্বাস করি আমরা। আমরা বিশ্বাস করি সেই সরকারে, যাদের দ্বারা দেশের উন্নয়ন সম্ভব; তাদের সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্ব। আর সেই সরকার আমাদের কাছে সাহায্য চাইলে করব।’
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, আফগানিস্তানের সরকার ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট শপথ না নেওয়া পর্যন্ত ঢাকা দেশটিকে স্বাগত জানাতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমরা বলব, এটা স্টিল প্রিম্যাচিউরড। যতক্ষণ পর্যন্ত একজন প্রেসিডেন্ট শপথ না নিচ্ছেন; যতক্ষণ পর্যন্ত একজন রাজা পারমানেন্টলি না আসবে অর্থাৎ তাদের সংবিধান অনুযায়ী চার বা পাঁচ বছরের সরকারের মেন্ডেট নিয়ে কেউ না আসা পর্যন্ত আমরা তাদের স্বাগত জানাতে পারি না। এটা ঠিকও হবে না।’
আফগানিস্তানে থাকা বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আফগানিস্তান থেকে তিন বাংলাদেশিকে নিরাপদ অবস্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আরও সাত বাংলাদেশি নাগরিককে নিরাপদে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। এর চেয়ে বেশি তথ্য আমরা এখন প্রকাশ করতে চাচ্ছি না।’
শাহরিয়ার আলম এ সময় আরও বলেন, ‘আফগানিস্তানের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। যদিও ভ্রাতৃপ্রতিম ওই রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ভাটা পড়েছে। আমরা চাই আফগানিস্তানের জনগণের জানমালের ক্ষতি না হোক। সেখানে সক্রিয় সব রাজনৈতিক শক্তির প্রতি এটাই বাংলাদেশের আহ্বান।’
আফগানিস্তানের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভয়ের কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা সতর্ক আছি, এখানে উগ্রপন্থার উত্থান ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করবে। আমরা এতে অত্যন্ত সফল হয়েছি, বিশেষ করে হলি আর্টিজানের ঘটনার পর।’ তিনি আরও বলেন, ‘তৃতীয় কোনো দেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমরা আফগানিস্তানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। আঞ্চলিক সমৃদ্ধির জন্য আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক এটাই আমরা চাই। ওই দেশের মানুষের অনেক সক্ষমতা আছে। তারা সেই সক্ষমতা দিয়ে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।’
আফগানিস্তানে বাংলাদেশিদের যাতায়াতে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের এমন প্র্যাকটিস নেই। স্বাভাবিকভাবে যে দেশের আইনশৃঙ্খলা ভালো নয়, সে দেশে বাংলাদেশের মানুষ যাবেন না। এটা নতুন করে বলার কিছু নেই। আমরা লিখিতভাবে না বললেও আমরা নিরুৎসাহিত করব আফগানিস্তানে যেতে। তাদের সংবিধান অনুযায়ী স্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও সরকার শপথ নিলে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নেবে।’
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তালেবান যদি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আফগানিস্তানকে পরিচালনা করতে চায় তা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক হবে।’ দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষমতায়ন, ব্র্যাকের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, ব্যবসা-বাণিজ্যে সহযোগী হওয়ার সম্ভাব্য সুযোগের কথাও বলেন এ কূটনৈতিক বিশ্লেষক। আফগানিস্তানে পরিবর্তন আসার ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলোতে সম্ভাব্য পরিবর্তন প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি মনে করি তালেবান ক্ষমতায় এলে যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না, এমনটা মনে করার কারণ নেই। ভূ-রাজনীতি ও ভারসাম্যের বিষয় মাথায় রেখেই সরকার চালাতে হয়। তাই তালেবান সরকার গঠন করলে তাদেরও সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।’
পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন আফগান পরিস্থিতিতে দেশের অবস্থান সম্পর্কে গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাংলাদেশ আশা করে আফগানিস্তানের জনগণের কোনো দুর্ভোগ হবে না। নতুন সরকার দেশটির জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে।’
