তালেবানরা এখনো আফগানিস্তানে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করেনি। কিন্তু এর মধ্যেই তারা দেশটির নারীদের ওপর তাদের চিন্তাধারার শাসন জারি করতে শুরু করেছে। কান্দাহার-হেরাতসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় নারী শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। আবার কিছু জায়গায় জোরপূর্বক বিয়ে করার ঘটনাও সামনে আসছে। রাস্তায় কোনো নারী বোরকা ছাড়া বের হলে তাকে হেনস্তা করার নজিরও সৃষ্টি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একাধিক আফগান নারী তাদের নাম পরিবর্তন করে নিজেদের পরিস্থিতি সম্পর্কে বয়ান দিয়েছেন। কাবুল থেকে মরিয়াম ছদ্মনামে এক নারী রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা কাবুলে রয়েছি। আমি নিজের ও ভাইবোনদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। আমি আর ঘরের বাইরে পা রাখি না। কেনাকাটা করতে বা কফিশপে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। আমাকে এখন বোরকার জীবন বেছে নিতে হবে। আমার শিক্ষা, চাকরি, ভবিষ্যৎ সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। ২০ বছর পর জীবন আবারও শূন্যের দিকে যাত্রা করেছে।’
কান্দাহার থেকে মেহরিন নামে আরেক নারী বলেন, ‘আমি মেহরিন, একজন শিক্ষক। তালেবান আমার ঘরও ধ্বংস করে দিয়েছে। কান্দাহার ত্যাগ নিজের ইচ্ছায় নয়, বাধ্য হয়ে করেছি। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল এটি। কল্পনাও ছিল না যুদ্ধ এতটা তীব্র হয়ে উঠবে। রাত ১২টায় ঘরের পেছনের দেয়ালে যখন গোলা পড়ল, তখন বোরকা পরে বেরিয়ে পড়া ছাড়া কোনো উপায় থাকল না। পরে জেনেছি, আমাদের ও প্রতিবেশীদের বাড়িঘর তালেবান তাদের দখলে নিয়েছে। বাড়ি ছাড়ার সময় শুধু পরিচয়পত্র ও শিক্ষাসনদ নিয়ে বেরিয়েছি। আমার জন্য এ দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক সপ্তাহ আত্মীয়ের বাসায় থেকে ওয়ারদাকে ১৬ দিন কাটিয়ে কাবুলে একটি বাসা ভাড়া নিয়েছি।’
তালেবানরা আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের দখল নেওয়ার পর দেশটির বিভিন্ন দেয়াল ও বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে নারীর ছবি ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। গত রবিবার কাবুলের প্রবেশ করে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান যোদ্ধারা। দেশ ছেড়ে পালান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা গেছে, একটি বিউটি পার্লারের বাইরে নারীর একটি ছবির ওপর রং করা হচ্ছে।
১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান শাসন করে তালেবানরা। ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযানে উৎখাত হয় তারা। তালেবানের আগের শাসনামলে নারীদের শিক্ষা ও কাজ করা নিষিদ্ধ ছিল। একই সঙ্গে পুরুষ আত্মীয় ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হতে পারতেন না নারীরা। বাইরে যেতে অবশ্যই তাদের বোরকা পরতে হতো। একটি ছবিতে দেখা গেছে, এক ব্যক্তি সবুজ রঙের পোশাক পরা এক নারীর ছবি ঢাকতে রং লাগাচ্ছেন। আরেকটি দেখা গেছে, বোরকা না পরা দুই নারীর ছবি রং দিয়ে ঢেকে ফেলা হচ্ছে।
তালেবান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আফগান নারীরা তাদের জীবন ও অধিকার নিয়ে শঙ্কিত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তালেবান মুখপাত্র সুহেল শাহিন বলেছেন, তাদের শাসনে নারীরা স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবে। তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। শিক্ষা ও কাজের অধিকার থাকবে। এটি আমাদের একটি প্রতিশ্রুতি।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই কাবুলের নারীদের মধ্যে বোরকা কেনার হিড়িক পড়েছে বলে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কাবুলের ব্যবসায়ী আরেফ। প্রথম নজরেই তার দোকানে সারি সারি নীল বোরকা সাজিয়ে রাখতে দেখা গেল। বোরকা বিক্রি এতটা বেড়ে গেছে যে, ঝুলিয়ে রাখা বোরকাগুলো দেখে যে কারও মনে হবে সেখানে ভারী পর্দা ঝুলছে। তালেবান কাবুলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই কাবুলের ভেতরে থাকা নারীরা বোরকা কিনতে মার্কেটগুলোতে ভিড় করতে শুরু করেন। আরেফ বলেন, আগে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে নারীরা এখানে বোরকা কিনতে আসত। কিন্তু এখন শহরের নারীরাও বোরকা কিনতে শুরু করেছে।
