মুক্তিসংগ্রামের সশস্ত্র রণকৌশল ও শেখ মুজিব

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২১, ১০:২৭ পিএম

(সোমবার প্রথম কিস্তির পর)

২. ১৯৫১-তে রাওয়ালপিন্ডি মামলার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল গোপনে। পাবলিক শুনেছে শুনানি চলছে, জানতে পারেনি কীভাবে এগোচ্ছে মামলা। ১৯৬৮-তে আইয়ুব খান ভেবেছিলেন যে আগরতলা মামলা যেহেতু আরও বেশি রাজনৈতিক, তাই এটিকে প্রকাশ্যে করলে দেশপ্রেমিক পশ্চিমের মানুষ তো অবশ্যই, পূর্ববঙ্গের মানুষও ষড়যন্ত্রকারীদের ওপর ভীষণভাবে ক্ষেপে উঠবে। একজন সামরিক অফিসার মন্তব্য করেছিলেন, হয়তো দেখা যাবে ‘রাষ্ট্রদ্রোহীদে’র পরিবারকে পুলিশের পাহারা দিয়ে রক্ষা করতে হচ্ছে। তারা অনুমান করতে পারেনি যে পূর্ববঙ্গের মানুষ গোটা বিষয়টাকে সম্পূর্ণ উল্টোভাবে দেখবে; ভাববে এটি দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের একটি ষড়যন্ত্র ভিন্ন অন্যকিছু নয়। মামলার অভিযোগনামার কতটুকু সত্য, কতটা মিথ্যা, এ জিজ্ঞাসাটা তখন ছিল না; বোধটা ছিল এই রকমের যে আসল সত্য হলো এটা পূর্ববাংলার মানুষকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা আরও একটি চেষ্টা। এবং তার বিপরীতে এই উপলব্ধিটা ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে যে যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তারা কোনো অপরাধ করেননি, বরং ঠিক কাজটিই করেছেন, পূর্ববঙ্গকে স্বাধীন করার জন্য প্রাণের ঝুঁকি নিয়েছেন। সরকার সংবাদপত্রের ওপর কঠিন নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে রেখেছিল। কিন্তু মামলা যেহেতু প্রকাশ্যে হচ্ছে তাই সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছিল এবং তারা অভিযুক্তদের জবানবন্দি, কারও কারও ওপরে দৈহিক নির্যাতনের মর্মন্তুদ বিবরণ, এবং জেরার মুখে সরকারপক্ষীয় সাক্ষীদের নাজেহাল দশার কাহিনী যতই প্রচার করতে থাকলেন জনমত ততই অভিযুক্তদের পক্ষে বেশি বেশি করে চলে যাওয়া শুরু করল। কেবল পক্ষেই গেল না, মনে করা আরম্ভ হলো যে এ মামলায় পূর্ববঙ্গের জনগণও জড়িত। আগরতলা মামলার শুনানিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আনার ব্যাপারে সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খানের বিশেষ রকমের উৎসাহ ছিল; মোটা বুদ্ধিতে তিনি হয়তো হিসাব করেছিলেন যে মামলার ফলে অন্য অভিযুক্তরা তো অবশ্যই সর্বাধিক ঘৃণার পাত্র হবেন শেখ মুজিব নিজে। উল্টোটা যে ঘটবে এটা তাদের অনুধাবনের বাইরেই ছিল। গোয়েন্দারাও বুঝতে পারেনি পূর্ববঙ্গের মানুষের মনের ভেতরে কী ঘটছে।

৩. আগরতলা মামলার সঙ্গে ১৮৫৭-এর সিপাহি অভ্যুত্থানের মিল আছে। প্রথমত, দুটোই ছিল স্বাধীনতার যুদ্ধ। দ্বিতীয়ত, দুটোতেই অংশগ্রহণটা সেনা অফিসারদের ছিল না, ছিল অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্গের সেনাদের। আগরতলা অভ্যুত্থানের মূল সংগঠক লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনই ছিলেন সর্বোচ্চ পদে; তিনি নৌবাহিনীর সদস্য, স্থলবাহিনীর হলে তার র‌্যাংক হতো মেজরের, অন্যরা তার তুলনায় নিম্নপদস্থ ছিলেন। মোয়াজ্জেম অফিসারদের কারও কারও দ্বারস্থ হয়েছিলেন, তেমন একটা সাড়া পাননি। না-পাওয়ার কারণ অফিসাররা প্রমোশন পাবেন আশা করতেন, তারা সুযোগ-সুবিধাও ভালোই পেতেন; এবং তারা ততটা অপমানিতও হতেন না নিচের লোকদের যেমনটা হতে হতো। অপমানের ব্যাপারটা ছিল দুঃসহ। পাঞ্জাবি অফিসাররা অধিকাংশই ছিল বর্ণবিদ্বেষী; তারা বাঙালিদের পদে পদে অপমানিত করত। সেনা অভ্যুত্থানকারীদের বেশির ভাগই ছিলেন নৌবাহিনীর সদস্য। তারা জাহাজে থাকতেন, নয়তো থাকতেন নৌ-সেনাছাউনিতে। সেখানে ছোট পরিসরে কাছাকাছি থাকতে হতো, গোটা সেনাবাহিনীর তথা পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বাঙালি-বিদ্বেষের একটা ঘনীভূত রূপ সেখানে বাঙালি নৌ-সেনাদের সহ্য করতে হতো; বিদ্রোহের চেতনাটা তাই তাদের মধ্যেই ছিল সর্বাধিক প্রখর। একই রকমের ব্যাপার ঘটেছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে; সেখানেও ভারতীয় নৌ-সেনারা ইংরেজ অফিসারদের কাছে অপমানের শিকার হতেন; যেটি অন্যতম কারণ ছিল ১৯৪৬ সালে নৌ-বিদ্রোহের।

বলা যাবে যে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালি সেনাদের অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাটি ছিল অগোছালো ও অবাস্তবিক। অগোছালো অবশ্যই, কিন্তু একেবারে যে অবাস্তবিক ছিল এমন নয়। অভ্যুত্থান ঘটার কথা পূর্ববঙ্গে। সেখানে তখন পাকিস্তানি সেনা ছিল ১২ থেকে ১৩ ব্যাটালিয়ন। অর্থাৎ ১২-১৩ হাজারের বেশি নয়। এর ভেতর বাঙালি সদস্যরাও ছিল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিকাংশ সৈনিকই ছিল বাঙালি। ব্যাটালিয়নগুলো বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। কমান্ডো কায়দায় একই দিনে একই সময়ে অস্ত্রাগারগুলো দখল করে নেওয়া অসম্ভব ছিল না; যেমন ঘটনা সূর্য সেনদের যুববিদ্রোহের সময় ঘটেছিল ১৯৩০-এ। অভ্যুত্থানের পরিকল্পনায় ছিল ক্যান্টনমেন্টগুলো দখল করে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে। শেখ মুজিব চলে আসবেন বেতার কেন্দ্রে এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন স্বাধীনতার। পূর্ববঙ্গের সেনাছাউনিতে কারিগরি ও অন্যান্য কাজ বাঙালিরাই করত; আশা করা অসংগত ছিল না যে বিদ্রোহে তারাও যোগ দেবে। জনগণেরও চলে আসার কথা চতুর্দিক থেকে। তবে এর জন্য আরও প্রস্তুতি দরকার ছিল। অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ত। অপরিহার্য ছিল সদস্য বৃদ্ধি, স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ ও যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ। সর্বোপরি সমর্থন ও সহযোগিতা আবশ্যক ছিল ভারতের। এসব কাজে অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকারীরা নিজেদের নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু সময় পাননি। সূর্যসেনদের যুববিদ্রোহের সময় ভারতের অপরাঞ্চলেও বিদ্রোহের প্রস্তুতি ছিল, ভগৎ সিং-রা করেছিলেন, যদিও দুটি ধারার ভেতর কোনো সংযোগ ঘটেনি। মোয়াজ্জেমদের পরিকল্পনায় কিন্তু সূর্য সেন যেমন ছিলেন, ঠিক তেমনি ছিলেন ভগৎ সিংও। ভগৎ সিং-রা সূর্যসেনদের তুলনাতেও অগ্রসর ছিলেন, তারা কেবল জাতীয় মুক্তিতে নয় সমাজতন্ত্রেও বিশ্বাস করতেন। মোয়াজ্জেমরাও দৃষ্টিভঙ্গিতে শুধু জাতীয়তাবাদী নয়, সমাজতান্ত্রিকই ছিলেন। যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন মোয়াজ্জেম তার সহকর্মীদের সামনে তুলে ধরেছিলেন তাতে রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ হবে বলা হয়েছিল; এবং সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকবে, থাকবে প্রতিটি নাগরিকের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার নিশ্চয়তা এমনটাই তারা চিন্তা করেছেন। ব্যক্তিগত সম্পত্তির সামাজিকীকরণ, এবং শিল্প-কারখানার জাতীয়করণের কথাও তারা ভেবেছিলেন। সূর্যসেন যেন হাত রেখেছেন ভগৎ সিং-এর হাতে।

অভ্যুত্থানের সম্ভাবনাকে পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা কম গুরুত্ব দেয়নি। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পরে আইয়ুব নেই, ইয়াহিয়া এসেছেন; মোয়াজ্জেমরা সবাই বহিষ্কৃত; কিন্তু তখনো দেখা যাচ্ছে সেনাশাসকদের চোখে মোয়াজ্জেমরা আগের মতোই বিপজ্জনক। পঁচিশে মার্চের আগেই তারা তিনজন মানুষকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে রেখেছিল প্রথম সারির শত্রু হিসেবে। তারা হলেন শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ ও লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। প্রথম দুজনকে যে তারা প্রধান শত্রু হিসেবে জানবে সেটা তো সবাই জানত; কিন্তু মোয়াজ্জেম কেন? তিনি তো এখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন, সেনাবাহিনীতে নেই; হ্যাঁ, লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি তো তেমন জোরদার কোনো সংগঠন ছিল না। তাকে মস্ত বড়ই শুধু নয়, প্রধান শত্রুদেরই একজন ভাবার কারণ নিশ্চয়ই ছিল। তাদের রাগ ছিল। তারা জানত মোয়াজ্জেমদের অভ্যুত্থান-চেষ্টাটা মিথ্যা ছিল না। সঙ্গে আরও একটা কারণ ছিল। সেটা এই যে সেনাশাসকরা দেখতে পেয়েছিল যে সেনাছাউনিতে মোয়াজ্জেম যে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, কালক্রমে সেটা অনেক বড় হয়ে দেখা দেবে, বাঙালি সেনারা, ইপিআরের জোয়ানরা, পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা গণহত্যার বিরুদ্ধে খালি হাতে নয়, সশস্ত্র অবস্থায় রুখে দাঁড়াবে। পঁচিশে মার্চের রাতে তারা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছিল; তাজউদ্দীন আহমদকে ধরতে পারেনি, পারলে কী করত আমরা জানি না; তবে মোয়াজ্জেম হোসেনকে ধরতে পেরেছিল এবং তাকে আর জীবন্ত রাখেনি, সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করেছে।

মোয়াজ্জেম হয়তো বোঝেননি যে হানাদারদের কাছে তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন; বুঝলে হয় তো সরে যেতেন, তাজউদ্দীন যেমন গিয়েছিলেন, একেবারে শেষ মুহূর্তে। তার গুরুত্ব মুক্তির একটা পথ প্রদর্শনের কারণে। পথটা সশস্ত্র সংগ্রামের। পাকিস্তানি দখলদারদের হাত থেকে মুক্তি যে সাংবিধানিক পথে আসবে না সে বার্তাটা রটিয়ে দিয়েছিলেন তিনিই। আগেই, ১৯৬৪-তেই। ঊনসত্তরে দেশে বিরাট বড় একটা গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে; তার আওয়াজ ছিল, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, পূর্ববাংলা স্বাধীন করো’ এবং ‘শ্রমিক কৃষক অস্ত্র ধরো, পূর্ববাংলা স্বাধীন করো’; দুটি মিলে একটি আওয়াজই, সেটি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের। মোয়াজ্জেমরাও ওই আওয়াজই দিয়েছিলেন, তাদের এক আওয়াজে ওই দুই আওয়াজই ছিল। ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানের পেছনে বড় একটি অনুঘটক ছিল এই আগরতলা মামলা। ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’, এই আওয়াজ জোরালো হয়ে উঠেছিল। আওয়াজটি চূড়ান্ত স্তরে উত্তীর্ণ হয় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যখন প্রকাশ্য জনসভায় ঘোষণা দেন যে প্রয়োজনে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে শেখ মুজিবকে মুক্ত করা হবে, জনতা পাকিস্তানিদের বাস্টিলের দুর্গ ভেঙে ফেলবে। ছাত্ররা ছিল অনমনীয়, অবস্থানে। মেহনতি মানুষ এসে যোগ দিয়েছিল আন্দোলনে, তাদের যোগদানের পরে অবধারিত হয়ে উঠেছিল যে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হবে, এবং অভিযুক্তরা সবাই সসম্মানে মুক্তি পাবেন। সেটাই ঘটেছে। তার পরে নির্বাচন হয়েছে, শেখ মুজিব অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বের হয়ে এসেছেন। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘটেনি। ঘটেছে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, যেমনটা ঘটবে বলে মোয়াজ্জেম হোসেনরা মনে করতেন। আর ওই মনে করার জন্যই তো তাকে প্রাণ দিতে হলো, যুদ্ধের সূচনা মুহূর্তেই। মোয়াজ্জেম হোসেন বন্দি অবস্থায় লেখা তার জবানবন্দিতে তার ওপর নির্মম নির্যাতনের বিবরণই শুধু দেননি, কেন তিনি অভিযুক্ত হয়েছেন সেই সত্যটাও তুলে ধরেছেন। সেটা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত প্রতিবাদ। অন্যায় ও অনিয়ম দেখলেই তিনি প্রতিবাদ করতেন। লিখেছেন, ‘এটা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, যখন পূর্ব পাকিস্তানিদের কোনো ন্যায্য বিষয় নিয়েও আমি ফয়সলার উদ্যোগ নিতাম, তখনই আমাকে বলা হতো প্রাদেশিকতাবাদী এবং কখনো কখনো মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে বলে আমাকে হুমকি দেওয়া হতো।’ মনস্তাত্ত্বিক বিবেচনায় মোয়াজ্জেমদের বিদ্রোহ-পরিকল্পনার বড়মাত্রার ইতিবাচক দিক দুটি; একটি এই বার্তা যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত, অপরটি পাকিস্তানি সেনারা যতই ভয়ংকর হোক তাদের ভয় করে চলার ঐতিহ্যটি ভাঙা চাই। আর এটা তো তারা জানিয়ে গেছেনই যে মুক্তির জন্য দর-কষাকষি যথেষ্ট নয়, অভ্যুত্থান প্রয়োজন।

৪. সেনাছাউনিতে মুক্তিসংগ্রাম ও আগরতলা মামলা আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আমাদের মুক্তিসংগ্রামে মূলধারার সঙ্গে একাধিক উপধারা ছিল, বড় একটি উপধারা সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা। ঘটনা হিসেবে যেমন, পথপ্রদর্শক হিসেবে ততোধিক। এই উপধারাটি ছিল একাধারে রাজনৈতিক, সশস্ত্র এবং সমাজতান্ত্রিক। এটিকে না-জানলে আমাদের ইতিহাস জ্ঞান কিছুতেই, এবং কখনোই, পূর্ণাঙ্গ হবে না। বিষয়টি নিয়ে লেখা হয়েছে, আরও লেখা এবং অনুসন্ধান প্রয়োজন। আবু সাঈদ খান যে এই বইটি লিখেছেন সেজন্য আন্তরিক অভিনন্দন ও সবিশেষ ধন্যবাদ তার প্রাপ্য। এ বিষয়ে এ পর্যন্ত যত কিছু লেখা হয়েছে সেগুলো তিনি অভিনিবেশের সঙ্গে পড়েছেন, অভিযুক্তদের কয়েকজনের এবং তাদের আপনজনদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, এবং ইতিহাসের ওই অংশটিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। অনেক তথ্যই হারিয়ে যেত, এবং তার দুঃখ আরও আগে কেন সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু করেননি, করলে তাদেরও পাওয়া যেত যারা এরই মধ্যে চলে গেছেন। তার সে-দুঃখ আমাদেরও। তবে যে কাজটি তিনি করেছেন তা অত্যন্ত মূল্যবান, জাতীয় মুক্তির ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তার এই বই ব্যবহৃত হবে। তিনি দেখিয়েছেন আগরতলা মামলা অস্বাভাবিক ও হঠাৎ-ঘটা ব্যাপার ছিল না; এটা ঘটেছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়। এই দেখানোটাও খুব জরুরি।

অভিযুক্তদের যে ব্যক্তিগত পরিচয় তিনি সংগ্রহ করেছেন তাতে দেখা যায় পরবর্তী সময়ে, একাত্তরের যুদ্ধে, এরা সবাই কোনো না কোনোভাবে অংশ নিয়েছেন। লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনও নিশ্চয়ই নিতেন, যদি না হানাদাররা তার প্রাণ হরণ করত। মোয়াজ্জেমের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন ছিলেন স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে তার স্থান তৃতীয়; মোয়াজ্জেমের পরেই। এই যোদ্ধাটি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও স্থিরপ্রতিজ্ঞ। তিনি আগরতলায় গিয়েছিলেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের প্রত্যাশায়। একাত্তরের যুদ্ধে তার অংশগ্রহণ ছিল বীরোচিত ও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যুদ্ধশেষে, ১৯৭২-এর ৫ জানুয়ারি এক দল দুর্বৃত্ত তাকে বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয় থেকে ডেকে নিয়ে যায়; তারপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। অন্তর্ধান রহস্যের যে উদ্ধার হবে তাও ঘটেনি। যুদ্ধের পরে আগরতলা মামলায় অভিযুক্তদের অধিকাংশই রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন; কেউ গেছেন আওয়ামী লীগে, কেউ জাসদে, কেউ-বা মস্কোপন্থি ন্যাপে। স্টুয়ার্ড মুজিবও নিশ্চয়ই রাজনীতিতে যোগ দিতেন; সেজন্যই কি তাকে সরিয়ে দেওয়া? এরও অনুসন্ধান প্রয়োজন, পরবর্তী ইতিহাস বোঝার জন্য।

(সমাপ্ত)

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত